যে কারণে ১০ রমজান প্রিয়নবির দুঃখের দিন

ramadan১০ রমজান। রহমতের দশকের শেষ দিন। নবুয়তের দশম বছরের এ দিন প্রিয়নিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর দুঃখের দিনের সবচেয়ে কাছের মানুষ, প্রিয়সঙ্গী ও প্রাণপ্রিয় স্ত্রী হজরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে হারিয়েছেন।

হজরত খাদিজাতুল কুবরা রাদিয়াল্লাহু আনহা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রথম স্ত্রী। তিনি উম্মাহাতুল মুমিনিন বা মুমিনদের মা। সর্ব প্রথম ইসলামগ গ্রহণকারীও ছিলেন তিনি। ইসলাম ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনে রয়েছে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান। যার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা তুলে ধরা হলো-

জন্ম ও পরিচিতি
হজরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা হাতি বাহিনী কর্তৃক কাবা আক্রমণের ১৫ বছর আগে ৫৫৫ খ্রিস্টাব্দে পবিত্র মক্কা নগরিতে জন্ম গ্রহণ করেন। মক্কার উচ্চ শিক্ষিত ও বিখ্যাত ব্যবসায়ী খুয়াইলিদের দ্বিতীয় সন্তান তিনি। মাতার নাম ফাতিমা বিনতে যায়িদ।

উপাধি
তাঁর কুনিয়াত ছিল ‘উম্মুল হিন্দ’ এবং উপাধি ছিল ‘তাহিরা’। মুসলিম উম্মাহর কাছে তিনি উম্মুল মুমিনিন নামে সবচেয়ে বেশি পরিচিত।

গুণ
স্বভাবতই উত্তরাধিকার সূত্রইে খাদিজা ছিলেন একজন বিত্তবান, প্রভাবশালী ও বিদুষী নারী । খুব সুন্দরীও ছিলেন তিনি। তাঁর ব্যক্তিত্ব ও প্রখর বুদ্ধিমতী অতুলনীয়।

ব্যবসায়ী
তাঁর পিতা খুয়াইলিদ জীবিত থাকাবস্থায়ই তিনি পিতার ব্যবসা দেখাশুনা করতেন। যদিও তাঁর আরো দুই ভাই এবং তিন বোন ছিল তথাপিও তিনি তাঁর পিতার ব্যবসা পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন।

বিশ্বনবির সততা ও প্রতিভায় আকৃষ্ট
তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নবুয়তের আগে তাঁর ব্যবসার প্রতিনিধি নিয়োগ দেন। বিশ্বনবির ব্যবসায়িক কাজের সহযোগিতায় তিনি তার বিশ্বস্ত দাস মায়সারাকে বিশ্বনবির সঙ্গে প্রেরণ করেন।

বিশ্বনবি মায়সারাকে সঙ্গে নিয়ে খাদিজার পণ্য-সামগ্রী নিয়ে তা বিক্রয় করে আবার মক্কার উপযোগী পণ্য ক্রয় করে মক্কায় ফিরে আসেন। সে বাণিজ্যে অন্যান্য সময়ের তুলনায় খাদিজার দ্বিগুণেরও বেশি মুনাফা হয়।
খাদিজা তার বিশ্বস্ত দাস মায়সারার কাছ থেকে বিশ্বনবির ব্যবসায়িক সফরের আদি-অন্ত জেনে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন।

বিবাহের প্রস্তাব
বিশ্বনবির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও গুণে মুগ্ধ হয়ে হজরত খাদিজা তাঁকে বিবাহের প্রস্তাব পাঠান। যেখানে মক্কার সম্ভ্রান্ত ও ধনী ব্যক্তিগণের একাধিক বিবাহের প্রস্তাবও হজরত খাদিজা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।

সাদিক-তাহিরার বিবাহ
জাহেলি যুগের তাহিরার সঙ্গে ঐ যুগেরই সাদিক বা আলআমিনের সঙ্গে বিবাহ সংঘটিত হয়। তখন হজরত খাদিজার বয়স যখন ৪০ বছর। বিশ্বনবির বয়স তখন ২৫ বছর। এমনকি উভয়ের বিবাহের খরচও বহন করেন হজরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা। তিনি উভয়ের বিবাহের পোশাকের জন্য দুই উকিয়া স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা ব্যয় করেন।

সন্তান জন্মদান
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঔরসেই তাঁর দুই ছেলে চার মেয়েসহ ছয় সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। প্রথম সন্তান কাসিম অল্প বয়সে মক্কাতেই ইন্তেকাল করেন। তৃতীয় সন্তান আবদুল্লাহ বিশ্বনবির নবুয়ত প্রাপ্তি পর জন্ম লাভ করেন এবং অল্প বয়সেই ইন্তেকাল করেন। দ্বিতীয় সন্তান হজরত যয়নব, চতুর্থ সন্তান রুকাইয়া, পঞ্চম সন্তান উম্মু কুলসুম এবং ৬ষ্ঠ সন্তান হজরত ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহা।

বিশ্বনবির খেদমতে খাদিজা
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবুয়ত লাভ করবেন এ কথা হজরত খাদিজা পূর্বে থেকেই জানতে পেরেছিলেন। সে কারণেই বিশ্বনবির নবুয়ত লাভের পূর্বে হেরা গুহায় ধ্যনমগ্ন থাকাকালীন সময়ে তিনি বিশ্বনবিকে সর্ব প্রকার সহযোগিতা করেছেন।

হজরত জিবরিল আমিনের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতে তিনি ভয় পেলে হজরত খাদিজাই তাঁকে অভয় দিয়ে বলেছিলেন-
‘আপনি কারো ক্ষতি করেননি, তাই কেউ আপনার ক্ষতি করবেন না। এমনকি তাঁকে মানসিকভাবে শক্তি যোগাতে তিনি তাঁর চাচাতো ভাই তাওরাতের বিশেষজ্ঞ ওরাকা বিন নওফেলের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন।

সর্ব প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী
হজরত খাদিজার বিয়ে পনের বছর পর বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবুয়ত লাভ করেন। নবুয়ত লাভের পর ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণের সৌভাগ্য হয়েছিল হজরত খাদিজাতুল কুবরা রাদিয়াল্লাহু আনহার।

সম্পদ ওয়াকফ
হজরত খাদিজাতুল কুবরা রাদিয়াল্লাহু আনহু ইসলাম গ্রহণের পর তার সব ধন-সম্পদ ইসলামের প্রচারের লক্ষ্যে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হস্তান্তর করেন।

ধৈর্য ও সহনশীলতা
নবুয়ত লাভের পর বিশ্বনবি ব্যবসা-বাণিজ্য ছেড়ে আল্লাহ ইবাদাত এবং ইসলামের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। সংসারের সকল আয় বন্ধ হয়ে যায়। ধৈর্য ও সহনশীলতার সঙ্গে তিনি সব প্রতিকূল অবস্থার মোকাবিলা করেন।

সান্ত্বনা প্রদান
ইসলামের দাওয়াত মুশরিকদের প্রত্যাখ্যান ও অবিশ্বাসের কারণে বিশ্বনবি যে ব্যথা অনুভব করতেন, হজরত খাদিজার কাছে আসলে তাঁর সে ব্যথা বেদনা বিদুরিত হয়ে যেত। ইসলাম প্রচারের কাজে হজরত খাদিজা তাঁকে সান্তনা দিতেন, সাহস ও উৎসাহ যোগাতেন। এমনকি মুশরিকদের সকল নির্যাতন ও অমার্জিত আচরণ তিনি অত্যন্ত হালকা এবং তুচ্ছ বলে বিশ্বনবির কাছে তুলে ধরতেন। যাতে তিনি শান্তি ও স্বস্থি লাভ করেন।

বন্দি অবস্থায় বিশ্বনবির সেবা
নবুয়তের সপ্তম বছর মহররম মাসে কুরাইশরা বিশ্বনবিসহ সকল মুসলমানকে বয়কট করেন। তখন তাঁরা শিয়াবে আবু তালিবে আশ্রয় গ্রহণ করেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে তিনিও সেখানে অন্তরীণ হন। প্রায় তিন বছর বনু হাশিমের সবাই দুর্ভিক্ষের মাঝে অতিবাহিত করেন। স্বামীর সঙ্গে হজরত খাদিজা সে সব দুঃখ-কষ্টগুলো হাসি মুখে বরণ করে নেন।

বিশ্বনবি, ইসলাম এবং মুসলমানদের এহেন দুর্দিনে হজরত খাদিজা নিজের প্রভাব খাটিয়ে মাঝে মাঝে খাদ্য-দ্রব্যের ব্যবস্থা করতেন। অমুসলিম হওয়া সত্ত্বেও হজরত খাজিদার আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে তিনি খাবারের ব্যবস্থা করতেন।

সর্ব প্রথম নামাজ আদায়
যখন নামাজ ফরজ হওয়ার হুকুম নাজিল হয়নি, ইসলাম গ্রহণ করে তিনি বিশ্বনবির সঙ্গে প্রথম থেকেই নামাজ আদায় করেন। যা হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু ইসলাম গ্রহণের পূর্বে দেখে ফেলেন।

পিতৃকূলে ওপর প্রভাব
হজরত খাদিজার ইসলাম গ্রহণ তার পিতৃকূলের ওপর বিশাল প্রভাব পড়ে। ইসলামের আর্বিভাবের সময় তাঁর বংশের ১৫ জন বিখ্যাত ব্যক্তি জীবিত ছিল। যাদের ১০ জনই ইসলাম গ্রহণ করে। বাকি পাঁচ জন বদরের যুদ্ধে কাফির অবস্থায় মৃত্যু বরণ করে।

স্ত্রীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ
বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর জীবদ্দশায় কোনো বিয়ে করেননি। তিনি ছিলেন বিশ্বনবির প্রথম স্ত্রী। হজরত ইবরাহিম ছাড়া তাঁর সব সন্তান হজরত খাদিজার গর্ভে জন্ম হয়। বিশ্বনবরি সব স্ত্রীদের মধ্যে তাঁর স্থান ছিলো সর্বোচ্চ।

বিশ্বনবির ভালোবাসা লাভ
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে আমৃত্যু ভালোবেসেছিলেন। হজরত খাদিজাকে তিনি বেশি বেশি স্মরণ করতেন।

প্রিয়নবির ভালোবাসার কারণ
বিশ্বনবির একমাত্র কুমারি ও অল্প বয়স্তী স্ত্রী হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘আপনি একজন বৃদ্ধার কথা মনে করে কাঁদছেন; যিনি মারা গেছেন।

জবাবে বিশ্বনবি বলেন, ‘কক্ষনো না, মানুষ যখন আমাকে মিথ্যে বলে উড়িয়ে দিতে চেয়েছে, সে তখন আমাকে সত্য বলে মেনে নিয়েছে। সবাই যখন কাফির ছিল সে তখন মুসলমান। কেউ যখন আমার সাহায্যে এগিয়ে আসেনি। তখন সে আমাকে সাহায্য করেছে। তাঁর গর্ভেই আমার সন্তান হয়েছে। হজরত খাদিজার মূল্যায়ন এর চেয়ে বেশি আর কি হতে পারে?

ওফাত
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে পঁচিশ বছর দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করার পর প্রিয়নবির নবুয়তের দশম বছরের ১০ রমজান ৬৫ বছর বয়সে মক্কায় ইন্তেকাল করেন। (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

দাফন
বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং তাঁর লাশ কবরে নামান। তাঁর মৃত্যুর সময় জানাযার নামাজের বিধান ছিল না বিধায় তাঁকে বিনা জানাযায় মক্কার জান্নাতুল মুয়াল্লায় দাফন করা হয়।

রহমতের দশকের শেষ দিন ১০ রমজান ছিল প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সবচেয়ে দুঃখের দিন। আর এ কারণেই হজরত খাদিজা ইন্তেকালের বছর ইয়ামুল হুজুন বা দুঃখের বছর নামে আখ্যায়িত করা হয়।
দশ রমজানের আজকের দিনে আল্লাহ তাআলা হজরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার প্রতি অগণিত অসংখ্য রহমত দান করুন। হজরত খাদিজাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন।

মুসলিম উম্মাহর সব নারীদেরকে হজরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার আমল-আখলাক ও আদর্শ গ্রহণ করার তাওফিক দান করুন। তাঁর অনুসরণে সংসার প্রতিপালন ও স্বামী খেদমতে তাঁকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।