শেষ কথা ‘বাবা আমার গলাটা শুকিয়ে যাচ্ছে চুরি করে হলেও দুই ফোঁটা পানি দাও’

nusrat

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসা ছাত্রীটি যন্ত্রণায় ছটফট করছেন।

বারবার পানি চাইলেও তাকে পানি দেয়া হচ্ছে না।

রোববার সকালে বাবাকে পেয়ে ছাত্রীটি তার কাছে পানির জন্য আকুতি জানান।

পানি দেয়া চিকিৎসকদের নিষেধ বলায় অনুনয় করে ছাত্রীটি বলেন, ‘বাবা আমার গলাটা শুকিয়ে যাচ্ছে।

চুরি করে হলেও দুই ফোঁটা পানি দাও বাবা।’ শরীরে ৭০ শতাংশের বেশি পোড়া ক্ষত নিয়ে অসহ্য যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন ছাত্রীটি।

nusrat

মেয়েকে দেখতে গিয়ে অজানা আশঙ্কায় তাকে চোখ বন্ধ না করার আকুতি জানান অসহায় বাবা। তিনি বলেন, ‘ঘুমাস নে মা চোখ খোলা রাখ।’

বার্ন ইউনিটের আইসিইউতে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা মেয়ের কাছে দুপুর ১টার দিকে যান অসহায় বাবা।

আইসিইউ থেকে বেরিয়ে তিনি নানা কথা বলেন। তিনি বলেন, আমার মেয়ে আমার দিকে তাকিয়ে কি যেন বলতে চেয়েছে, পানি খেতে চেয়েছে।

চোখ বন্ধ করলে আদরের মেয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে পারে এমন আশঙ্কা থেকেই তিনি বলেন, ‘ঘুমাস নে মা। চোখ খোলা রাখ।

nusrat (5)

জানি, তোর খুব কষ্ট হচ্ছে। তবু চোখ বন্ধ করিস না মা।’ তিনি আরও বলেন, তার মেয়ের কিছু হলে তিনি বাঁচবেন না।

তার একমাত্র মেয়েটি খুব শান্ত আর মেধাবী। পড়াশোনায় সব সময় সে প্রথম হয়। দাখিল পরীক্ষায় সে জিপিএ-৫ পেয়েছে।

হাসপাতালের বারান্দায় ছাত্রীটির মায়ের পায়ের কাছে বসে বিলাপ করছিলেন তার দুই ভাই। মা বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন।

অপরদিকে মেয়ের একটু স্বস্তির জন্য একবার মেয়ের কাছে আবার চিকিৎসকের কাছে ছুটছিলেন অসহায় বাবা।

তিন ভাই-বোনের মধ্যে বোনটি সবার ছোট। আদরের ছোট বোনকে দেখতে আইসিইউর দরজায় বারবার উঁকি দিচ্ছিল ছোট ভাই।

nusrat (3)

তার দু’চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল। তার গাল ভিজে যাচ্ছিল বারবার। তিনি মনে মনে প্রার্থনা করছিল বোনের জন্য।

ছোট ভাই জানান, বাড়িতে বোনটি তাদের সবাইকে আনন্দে মাতিয়ে রাখে। এখন আমার বোনের মুখের দিকে তাকাতে পারি না।

বোন আমার কথাও বলে না। বোনের কিছু হলে … । কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

ছাত্রীটিকে আইসিইউতে রাখার পর থেকে তার মা এর পাশেই রয়েছেন। বুক চাপড়িয়ে হাউমাউ করে তিনি প্রায় কাঁদছেন।

সেখানে গেলে তিনি বলেন, তার মেয়ে অনেক সময় পানি খেতে চায়। কিন্তু ডাক্তারের মানা থাকায় পানি দিতে পারি না।

kutta (2)

এ ঘটনায় অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা ও পৌর কাউন্সিলর মুকছুদ আলমসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন নুসরাত জাহান রাফির বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান।

এরই মধ্যে বুধবার রাত সাড়ে ৯টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নুসরাত জাহান রাফি মারা যান।

ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির জানাজায় অংশ নিতে হাজারো মানুষের ঢল নামে।

নুসরাত জাহান রাফির জানাজা সোনাগাজী সাবের সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

NUSRAT

জানাজায় ইমামতি করেন নুসরাতের বাবা একেএম মুসা মানিক। জানাজা শেষে মেয়ের লাশের সামনে দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। সেই সঙ্গে মেয়েকে জানান অশ্রুসিক্ত বিদায়।

বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টা ৫০ মিনিটে জানাজার পর সন্ধ্যা ৬টায় সোনাগাজী আল হেলাল একাডেমির পাশে সামাজিক কবরস্থানে চির নিদ্রায় শায়িত করা হয় নুসরাতের মরদেহ।

চোখের পানিতে বুক ভিজিয়ে নুসরাতকে কবরে শায়িত করেন বাবা মাওলানা মুসা মানিক ও বড় ভাই নোমানসহ আত্মীয়-স্বজনরা।

এ সময় কবরস্থান এলাকায় তৈরি হয় হৃদয় বিদারক পরিস্থিতি। নুসরাতের বাবা ও ভাইয়ের কান্নায় ভিজে যায় কবরের মাটি।