শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাস বর্জন!

studentকরো’নাভাই’রাস সংক্রমণ আতঙ্কে দিনকে দিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের দাবি জোরালো হচ্ছে। গতকাল রোববার বন্ধের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে বিক্ষোভ করেছেন।

আন্দোলন হয়েছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে।

এছাড়া সব স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ চেয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে দ্রুত সিদ্ধান্ত না এলে শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করছে।

তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় আগের অবস্থানেই অনড় রয়েছে। বলছে, এখনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। ফলে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করুন।

৬ বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস বর্জন

গত কয়েক দিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছেন শিক্ষার্থীরা। গতকাল ঢাবি, চবি, জবি, শেকৃবি, ইবি, বাকৃবিসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের দাবিতে আন্দোলন করেছে।

গত শনিবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের দাবিতে অনশনে বসলে ডাকসু প্রতিনিধিরাও এতে সমর্থন দিয়ে পাঁচ দাবিতে উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি দেয়। দাবির সঙ্গে গতকাল একাত্মতা জানিয়েছে শিক্ষক সমিতি ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ বিভাগের শিক্ষার্থীরা পূর্বঘোষণা অনুযায়ী ক্লাসে উপস্থিত হননি।

তবে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘এ বিষয় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় বসে নেই।

আগামীকাল (আজ) বিভিন্ন অনুষদের ডিন, ইনস্টিটিউটের পরিচালক, বিভাগের চেয়াপারসন, হল প্রভোস্ট এবং ডাকসু ও হল সংসদের নেতৃবৃন্দের অংশগ্রহণে একটি জরুরি সভার আহ্বান করা হয়েছে। সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

নগরীতে শিক্ষার্থী উপস্থিতি অর্ধেকে

রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি অর্ধেকে নেমে এসেছে। এর মধ্যেই ১৭ মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও জাতীয় শিশু দিবস উপলক্ষে নানা আয়োজনের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।

গতকাল নগরীর বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরেজমিনে ঘুরে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম দেখা গেছে। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি, উদয়ন, রেসিডেন্সিয়াল, মোহাম্মদপুর উচ্চ বিদ্যালয়, উইলস লিটল ফ্লাওয়ার, মতিঝিল আইডিয়ালসহ নামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে বলে জানায় কর্র্তৃপক্ষ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজধানীর কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা জানান, প্রতিষ্ঠান আপাতত বন্ধ থাকুক, তারাও চান। অভিভাবকরা প্রতিদিনই এসে তাদের উদ্বেগের কথা জানান।

অনেকেই সন্তানকে স্কুলে আনা বন্ধ করে দিয়েছেন। আমাদের ঝুঁকি নেওয়ার তো প্রয়োজন নেই।

অভিভাবকরা বলছেন, করো’নাভাই’রাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকার জনসমাগম এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে স্কুলের চেয়ে জনসমাগম আর কোথায় বেশি হয়? স্কুলে প্রবেশ ও ছুটির সময় ছোট ফটকে একে অপরের সংস্পর্শে সবচেয়ে বেশি আসা হয়।

ছোট্ট শ্রেণিকক্ষে ৭০ থেকে ৯০ শিক্ষার্থী চার-পাঁচ ঘণ্টা অবস্থান করে। ফলে কোনো শিক্ষার্থীর ভাইরাসের সংক্রমণ হলে, তা দ্রুত অন্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে।

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও আতঙ্কে রয়েছে। তারা গণপরিবহনে যাতায়াত করে। হলগুলোতে গণরুমে একসঙ্গে অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী থাকে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা থাকায় স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশনা পালন করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে একজন অসুস্থ হয়ে পড়লেও অন্য সবার অসুস্থ হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।

এ বিষয়ে মাউশির মহাপরিচালক ড. সৈয়দ গোলাম ফারুক বলেন, ‘আমরা বলেছি জনসমাগম হয় এমন আয়োজন এড়িয়ে চলতে। তবে সতর্ক অবস্থায় থেকে ১৭ মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ উদযাপনকে অনবদ্য ও স্মরণীয় করে রাখার লক্ষ্যে সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণে অথবা সুবিধাজনক স্থানে ১০০টি করে গাছ রোপণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’

অনড় শিক্ষার দুই মন্ত্রণালয়

শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওপর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের চাপ থাকলেও দুই মন্ত্রণালয়ই তাকিয়ে আছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের দিকে।

দুই মন্ত্রণালয়ই বলছে, তারা এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠান বন্ধের কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যেভাবে বলবে, সেভাবেই পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

গতকাল স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক আন্তঃমন্ত্রণালয়ের এক জরুরি বৈঠকে বলেছেন, তারা জনসমাগম এড়ানোর কথা বলছেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠান বন্ধ হবে কি না সেটা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিষয়। এরপরও শিক্ষা মন্ত্রণালয় আগের অবস্থানেই অনড় রয়েছে।

গতকাল বিকেলে বঙ্গবন্ধু ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক জাতীয় স্কুল হকি প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠান শেষে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, ‘দেশে স্থানীয় পর্যায়ে কোনো সংক্রমণই নেই।

বিদেশ থেকে সংক্রমণ বয়ে নিয়ে আসা হচ্ছে, যা বন্ধ করার চেষ্টা হচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এখন পর্যন্ত তেমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। তাই সবার কাছে বিনীত অনুরোধ করব, আতঙ্কিত হবেন না এবং আতঙ্ক ছড়াবেন না। সতর্ক থাকুন।’