যে যুদ্ধে বিশ্বের ৯৯ ভাগ মানুষ মারা পড়বে

warহযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘অদূর ভবিষ্যতে ফোরাত সোনার ভাণ্ডার উন্মুক্ত করে দেবে। সে সময়ে যে ওখানে উপস্থিত থাকবে, সে যেন তার থেকে কিছুই গ্রহণ না করে।’ (সহীহ বুখারি-খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ২৬০৫; সুনানে তিরমিজি-খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৬৯৮)

হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে আরো বর্ণিত, রাসুল সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
‘সেই পর্যন্ত কেয়ামত সংঘটিত হবে না, যতক্ষণ না ফোরাত থেকে সোনার পাহাড় বের হবে। তার জন্য মানুষ যুদ্ধ করবে এবং প্রতি একশ জনে নিরানব্বই জন লোক মারা যাবে। যে কজন জীবনে রক্ষা পাবে, তারা প্রত্যেকে মনে করবে, বোধ হয় একা আমিই জীবিত আছি!’ (সহীহ মুসলিম-খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২২১৯)

ফোরাত বা ইউফ্রেটিস নদী তুরস্ক থেকে সিরিয়ার ওপর দিয়ে ইরাকে গিয়ে শেষ হয়েছে। এর দৈর্ঘ্য দুই হাজার ৭০০ কিলোমিটার এবং এর ৯০ ভাগ পানির উৎস হল তুরস্কের মুরাত নদী ও কারাসু নদী। তুরস্কের বিরেচিক , সিরিয়ার রাক্কা প্রদেশ, দেইর আজজুর, মাদায়েন, ইরাকের রামাদি, ফালুজা, নিসিরিয়া, কুফা শহরগুলো মূলত এই ফোরাত নদীর উপরেই নির্ভরশীল। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে তুরস্ক, সিরিয়া ও ইরাক সরকার এখন পর্যন্ত ফোরাত নদীতে ১২টি ছোট বড় বাধ নির্মাণ করে। এ কারণে ১৯৯৯ সালের পরে ফোরাত নদীর পানি আশংকাজনক হারে কমতে শুরু করেছে। হাদীসে বলা হয়েছে, ফোরাত নদীর পানি শুকিয়ে স্বর্ণের পাহাড় ভেসে উঠবে। বর্তমান অবস্থার সাথে মিলিয়ে দেখলে বুঝা যায়, সেটি খুব বেশি দূরে নয়।

স্বর্ণের পাহাড় কবে ভেসে উঠবে?
বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত-তিনি বলেন, চতূর্থ ফিৎনা হচ্ছে, অন্ধকার অন্ধত্বপূর্ণ ফিৎনা বা বিশৃংখলা, যা সমুদ্রের ঢেউয়ের ন্যায় উত্তাল হয়ে আসবে। আরব-অনারবের কোনো ঘর বাকি থাকবে না। প্রত্যেক ঘরেই উক্ত ফিৎনা প্রবেশ করবে। যা দ্বারা তারা লাঞ্ছিত অপদস্ত হয়ে যাবে। যে ফিৎনাটি শাম দেশে (সিরিয়ায়) চক্কর দিতে থাকলেও রাত্রিযাপন করবে ইরাকে। তার হাত পা দ্বারা আরব ভুখন্ডের ভেতরে বিচরণ করতে থাকবে। উক্ত ফিৎনা এ উম্মতের চামড়ার সাথে চামড়া মিশ্রিত হওয়ার মতো মিশ্রিত হয়ে যাবে। তখন বিপদ-আপদ এত ব্যাপক ও মারাত্নক আকার ধারণ করবে, যা দ্বারা মানুষ ভালো খারাপ নির্ণয় করতে সক্ষম হবে না।
ওই মুহুর্তে কেউ উক্ত ফিৎনা বা বিশৃংখলা থামানোরও সাহস রাখবে না। একদিকে একটু শান্তির সুবাতাস বইলেও অন্যদিকে তীব্র আকার ধারণ করবে। সকালে কেউ মুসলমান থাকলেও সন্ধা হতে হতে সে কাফের হয়ে যাবে। উক্ত ফিৎনা থেকে কেউ বাঁচতে পারবেন না। শুধু ওই লোক বাঁচতে পারবে, যে সমুদ্রে ডুবন্ত ব্যক্তির মতো আল্লাহর কাছে বাঁচার জন্য করুণ সুরে আকুতি জানাতে পারবে। এ বিশৃংখলা প্রায় এক যুগ পর্যন্ত স্থায়ী থাকবে। এক পর্যায়ে সকলের কাছে সবকিছু স্পষ্ট হয়ে উঠবে। ইতোমধ্যে ফুরাত নদীতে স্বর্ণের একটি পাহাড় প্রকাশ পাবে, যা দখল করার জন্য সকলে যুদ্ধে জড়িয়ে যাবে এবং প্রতি একশ জনের নিরানব্বই জন মারা পড়বে। (আল ফিতান: নুয়াইম বিন হাম্মাদ, পৃষ্ঠা-৬৭৬)

হাদীসের বক্তব্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে দেখা যায়, সিরিয়া যুদ্ধ শুরু হয়েছে ২০১১ সালে। আর বর্তমান অবস্থা বার বছর স্থায়ী থাকবে, তারপর ফোরাত নদীর তীরে সোনার পাহাড় ভেসে ওঠবে। অর্থাৎ তা ২০২৩ সালে।

কোথায় স্বর্ণের পাহাড় ভেসে উঠবে?
সিরিয়ার দেইর-আজ-জুর প্রদেশের কিরকিসিয়া নামক ঐতিহাসিক এলাকার নিকটবর্তী স্থানেই ২০২৩ সালে স্বর্ণের পাহাড় ভেসে উঠবে। উদ্বেগের বিষয় হল, সিরিয়ার দেইর আজ জুর প্রাদেশিক সরকার ২০০৯ সালে এই এলাকার শুষ্ক মৌসুমে ঠিকমত কৃষিজমিতে ও শহরে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য হালাবিয়্যাহ বাঁধ নির্মাণ করার কাজ শুরু করে, যেটি ২০১২ সালে শেষ হয়েছে। তারপর থেকেই দেইর আল জুর প্রদেশে পানির স্বল্পতা দেখা যাচ্ছে। তাই বর্তমান পরিস্থিতি হাদীসের বর্ণনার সাথে পুরোপুরি মিলে যাচ্ছে।

হযরত আরতাত (রহঃ) থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, যখন তুর্কী (তুরস্ক) , রোম (আমরিকা) এবং খাসাফ জাতি (সম্ভবত কুর্দি বাহিনী) দিমাশকের এক প্রান্তরে জমায়েত হবে এবং দিমাশকের মসজিদের পশ্চিম প্রান্তে আরেকদল ভুপাতিত হবে, তখনই শাম দেশে (সিরিয়াতে) আবকা, আসহাফ এবং সুফিয়ানীদের তিনটি ঝান্ডা প্রকাশ পাবে। দিমাশক (দামেস্ক, বর্তমান সিরিয়ার রাজধানী) এলাকাকে জনৈক লোক অবরুদ্ধ করে রাখবে। এক পর্যায়ে সেই লোক (বাশার আল আসাদ) এবং তার সাথীদেরকে হত্যা করা হলে বনু সুফিয়ান থেকে আরো দুইজন লোকের আত্মপ্রকাশ হবে। তখন যেন দ্বিতীয় বিজয় পাওয়া গেল। অতঃপর যখন আবকা গোত্রের লোকজন মিশর থেকে এগিয়ে আসবে, তখনই সুফিয়ানী তার সৈন্যদের সাহায্যে তাদের সামনে আত্নপ্রকাশ করবে। রোম (আমরিকা) এবং তুর্কীরা (তুরস্ক) মিলে কারকায়সিয়া নামক স্থানে তাদেরকে হত্যা করবে এবং তাদের গোশত দ্বারা জঙ্গলে বাঘ-ভল্লুকরা তৃপ্ত হবে। (আল ফিতান: নুয়াইম বিন হাম্মাদ, পৃষ্ঠা-৮৩৩)

স্বর্নের পাহাড়কে কেন্দ্র করে কার বিরুদ্ধে কে যুদ্ধ করবে?
সিরিয়ার দেইর আজজুরের নিকটবর্তী কিরকিসিয়া নামক স্থানে যখন স্বর্ণের পাহাড়টি ভেসে উঠবে। তখন সিরিয়ায় প্রথম সুফিয়ানী ক্ষমতায় থাকবে। সে কালো পতাকাবাহী আসহাব জাতি ( ইসলামিক স্টেট) এবং হলুদ পতাকাবাহী তাওয়ারেগদের (তুর্কি) সিরিয়া থেকে বিতাড়িত করবে। তার পরেই ফোরাত নদীতে স্বর্ণের পাহাড় ভেসে উঠবে। তখন তুরস্ক ও আমরিকান জোট এটি দখল করতে এগিয়ে আসবে। তখন প্রথম সুফিয়ানী তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হবে এবং এই যুদ্ধে এক লক্ষ বা, এক লক্ষ ৬০ হাজার লোক নিহত হবে। কিন্তু কেউ এটি দখল করতে পারবে না।

অর্থাৎ নিকট ভবিষ্যতে ঘটনা পরিক্রমায় যা ঘটবে- ১. বাশার আল আসাদের মৃত্যুর পর সিরিয়াতে শিয়া আলাবী সম্প্রদায় ব্যাপক ভাবে হামলার মুখে পরবে এবং ইরাক ও সিরিয়াতে কালো পতাকাবাহী আসহাব জাতির (ইসলামিক স্টেট) পুনরায় ব্যাপক উত্থান হবে ।
২. লিবিয়া, আলজেরিয়া, মালি ও মিশরে কালো পতাকাবাহী আসহাব জাতির ব্যাপক উত্থান হবে।
৩. লিবিয়া, আলজেরিয়া, মালি ও মিশরে আসহাব জাতি উত্থানের পর তাদের দমন করার জন্য হলুদ পতাকাবাহী আবকা জাতি তাওয়ারেগ সম্প্রদায়ের উত্থান হবে।
৪. হলুদ পতাকাবাহী আবকা জাতি তাওয়ারেগ সম্প্রদায় কতৃক লিবিয়া ও মিশর দখলের পর সিরিয়ার হোমস শহরে ১৮ মাস অবরুদ্ধ করে রাখবে।
৫. হঠাৎ করে দক্ষিণ সিরিয়া ওয়াদিউল ইয়াবেস (দারা শহর থেকে) বানু কাল্ব গোত্রের প্রথম সুফিয়ানীর উত্থান হবে এবং নিজেকে মুসলিম বিশ্বের খলিফা দাবি করবে।
৬. প্রথম সুফিয়ানী সিরিয়া থেকে কালো পতাকাবাহী আসহাব জাতি এবং হলুদ পতাকাবাহী তাওয়ারেগ সম্প্রদায় কে পরাজিত করে বের করে দিবে।
৭. ফোরাত নদীর তীরে স্বর্ণের পাহাড় দখল করার জন্য তুরস্ক ও আমরিকান জোটের দেইর আজ জুরের নিকটবর্তী কিরকিসিয়া নামক স্থানে আগমন এবং প্রথম সুফিয়ানী ও তাদের মধ্যে মারাত্মক যুদ্ধ বাধবে।
৮. কিরকিসিয়া যুদ্ধের পর ইরাকের কুফা নগরীতে কালো পতাকাবাহী আসহাব জাতির ওপর গণহত্যা সংগঠিত হবে এবং তাদের ৭০ হাজার লোক নিহত হবে।
৯. মিশরে হলুদ পতাকাবাহী আবকা জাতি তাওয়ারেগ দেরকে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করার জন্য সুফিয়ানী কতৃক মিশর আক্রমণ হবে।
১০. খোরাসান (আফগানিস্তান ও তার পার্শ্ববর্তী দেশ সমূহ থেকে) শুয়াইব বিন সালেহ ও হারস হাররাস এর নেতৃত্বে কালো পতাকাবাহী দল নিয়ে ইরাকের কুফা নগরীতে আগমন এবং সুফিয়ানীকে পরাজিত করবে।
১১. এর ৬ বছর পর মক্কা নগরীতে ইমাম মাহদী (আঃ) এর আগমন ঘটবে।

দজলা ও ফোরাত নদীর পানি শুকিয়ে যাচ্ছে। এ নিয়ে নাসার গবেষকরাও খুবই চিন্তিত । ২০১৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নাসার গবেষকরা এবং ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি লক্ষ করছে, গত ১০ বছরে ১১৭ লক্ষ একর ফুট খাদের পানি শুকিয়ে গেছে। অর্থাৎ এই নদীর পানি শুকানো হচ্ছে কেয়ামতের কয়েকটা আলামতের একটা। কিন্তু কেয়ামত আসার আগে অনেক কিছুই ঘটবে, যেমন ইমাম মাহদি এবং দজ্জালের আবির্ভাব।

আবার কেউ কেউ এই হাদিসের ব্যাখ্যা করেছেন, এখানে ‘স্বর্ণ’ বলতে তেলসম্পদকে বোঝানো হয়েছে। কারণ খনিজ তেলকে ‘ব্ল্যাক গোল্ড’ বলা হয়। ২০০৩ সালে শুরু হওয়া ইরাক যুদ্ধে ফোরাত নদীর উপকূলবর্তী শহর ফালুজাতে মার্কিন ও মুজাহিদদের মধ্যে তীব্র যুদ্ধ হয়েছিল।