ব্যাংক ধ্বংসের নাঁটের গুরু আরাস্তু খান

arostoইসলামী ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান আরাস্তু খানকে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত ধ্বংসের নাঁটের গুরু বলে উল্লেখ করে “ম্যান বিহাইন্ড স্পয়েলিং ব্যাংক” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বাংলাদেশী ইংরেজি দৈনিক দ্য এশিয়ান এজ। পাঠকদের সুবিধার্থে প্রতিবেদনটি অনূদিত আকারে প্রকাশ করা হলো।

আরাস্তু খান, গত ৫ জানুয়ারি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড (আইবিবিএল)-এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর থেকে নানা বিতর্কিত কর্মকান্ডে জড়িয়েছেন বলে বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

তার শিক্ষা ও কর্ম-জীবন ঘেঁটে দেখা গেছে যে, তিনি ছাত্রজীবনে খুবই মেধাবী ছিলেন এবং ১৯৮২ সালে তিনি বাংলাদেশ কর্ম কমিশনের অধীনে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। সর্বশেষ তিনি অতিরিক্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরিকল্পনা কমিশনেরও সদস্য ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি অগ্রণী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সূত্রমতে, ব্যাংকার হওয়ার পর থেকেই বিতর্কিত কর্মকান্ডে নিজের মেধার অপচয় করতে শুরু করেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, তার আমলেই অগ্রণী ব্যাংকে একটি বড় ধরণের দূর্নীতি সংগঠিত হয়, যখন সৈয়দ আব্দুল হামিদ ও মিজানুর রহমান যথাক্রমে ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং এবং ডেপুটি ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন।

চলতি বছরের শুরুতে একটি স্বল্প পরিচিত প্রতিষ্ঠান, “আরমাডা স্পিনিং মিলস লিমিটেড”-এর প্রতিনিধি হিসেবে তিনি ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত হন ও পরে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। যদিও তিনি যে প্রতিষ্ঠানটিতে চাকুরী করেন সে প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে আজ পর্যন্ত বিস্তারিত কোনো তথ্য বা তা সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামী ব্যাংকের সার্বিক অর্থনৈতিক অবস্থার ব্যাপক অবনতি হওয়ায় দেশে-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন আরাস্তু খান। যে ইসলামী ব্যাংকটিকে খোদ অর্থমন্ত্রী একসময় বাংলাদেশের সবচেয়ে লাভজনক বেসরকারি ব্যাংক হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলেন, অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বর্তমানে সেই ব্যাংকটিকে ‘ঝুকিপূর্ণ’ ব্যাংক বলে চিহ্নিত করছেন।

এই মুহুর্তে ইসলামী ব্যাংক একদিকে যেমন খেলাপী ঋণে আক্রান্ত, অন্যদিকে ব্যাংকটির শেয়ারের দামও পড়তির দিকে। বিভিন্ন সূত্রের অভিযোগ, ব্যাংকটির শীর্ষ কর্তার একক সিদ্ধান্তে বিভিন্ন বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানকে যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই ঋণ প্রদান করা হয়েছে, যাদের মধ্যে অনেকেই তালিকাভূক্ত ঋণখেলাপি।

এদিকে ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার অবনতির পর বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা তার সম্পর্কে তদন্তে নামে, যাতে উঠে এসেছে আরও ভয়ংকর তথ্য। তাদের তথ্য অনুসারে, আরাস্তু খান পারিবারিক রাজনৈতিকভাবে বিএনপি-জামায়াতের সাথে সম্পৃক্ত।

দীর্ঘদিন ধরে তাকে যারা চেনেন, তাদের দাবি: আরাস্তু খান ছাত্রজীবনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন এবং পরবর্তীতে জামায়াতের সমর্থক হিসেবে অংশগ্রহণ করেন।

মানিকগঞ্জের রাজনৈনিক সূত্র জানিয়েছে, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও মানিকগঞ্জ জেলার সভাপতি আফরোজা খানের সাথে খুবই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে আরাস্তু খান ও তার পরিবারের।

অভিযোগ রয়েছে, ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান সম্প্রতি স্যোশাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড (এসআইবিএল)-এ ঘটে যাওয়া উচ্চ-পদের রদবদলে হস্তক্ষেপ করেছেন, যার কারণে ব্যাংকটি বর্তমানে অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে।

এছাড়াও, গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দেখা যায়, আরাস্তু খান জামায়াতের আদর্শের লোকদের ইসলামী ব্যাংকের উচ্চ পর্যায়ের পদে বসিয়েছেন। এছাড়াও তিনি আমার দেশ পত্রিকার সাবেক সম্পাদক মাহমুদুর রহমান-এরও খুব ঘনিষ্ঠ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ইসলামী ব্যাংকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণকারী বিভিন্ন উচ্চ পদের কর্মকর্তাদের সরিয়ে ব্যাংকটিতে স্বাধীনতাবিরীধীদের স্বর্গে পরিণত করার অভিযোগও রয়েছে।

এমনই একজন কাজী শহিদুল আলম, যাকে ব্যাংকের জার্যকরী পরিষদ এমনকি ইসলামী ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশন থেকে সরিয়ে দেন আরাস্তু খান; যার ফলে একসময় সামাজিক উন্নয়ন কর্মকান্ডের কারণে জনপ্রিয় ফাউন্ডেশনটি বর্তমানে মারাত্মক অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, বিএনপি-জামায়াতের একনিষ্ঠ সমর্থক হিসেসবে ১৯৯৬ সালের জনতার মঞ্চের বিরোধিতা করেছিলেন আরাস্তু খান। তবে, সাম্প্রতিক সময়ে তিনি নিজেকে সরকার দলের প্রতি একজন হিসেবে জাহির করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময়ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে তার যোগাযোগ রয়েছে বলে দাবি করেন।

রাজনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, আরাস্তু খানের ক্ষমতার নেপথ্যে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক এক জ্যেষ্ঠ সচিব এবং তার ক্ষমতাকে পুঁজি করেই আরাস্তু খান বাংলাদেশ ব্যাংকের পরবর্তী গভর্ণর হওয়ার পরিকল্পনা করেছেন।

ব্যাংকিং খাতসংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, আরাস্তু খান যার ক্ষমতাকে পুঁজি করছেন, সেই ব্যক্তি বর্তমান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণর নিয়োগেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সাবেক তথ্য সচিব একেএম শামীম চৌধুরী বলেন, “এ বিষয়টি খুবই আশ্চর্যের যে, আরাস্তু খানের মতো একজন বিএনপি-সম্পৃক্ত ব্যক্তি কিভাবে বর্তমান সরকারের অধীনে একটি উচ্চ পদে আসীন হয়েছেন? সে ১৯৯৬ সালের জনতার মঞ্চের বিরোধিতাকারী। সরকারের উচিৎ হবে খুব শীঘ্রই আরাস্তু খানকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে সে পদে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ লালন-পালনকারী কাউকে নিয়োগ দেওয়া।”