বুকের ভেতরে এক অসম্ভব চাপা কষ্ট রক্তক্ষরণ হচ্ছে আমার হৃদয়ে

tarana

এক সড়ক দুর্ঘটনায় বড় বোনের ছেলেকে হারিয়েছেন সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট তারানা হালিম।

সে হারানোর ব্যথা তার পরিবারকে প্রতিদিনই কষ্ট দিচ্ছে। প্রতিদিনের ব্যস্ততার মাঝেও বোনের আদরের ছেলে অর্ণবের কথা মনে পড়ে তারানা হালিমের।

আর যখনই তিনি অর্ণবের মতো সড়ক দুর্ঘটনায় আর কোনো তরুণের মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর পান তখনই সে ব্যথা আরও প্রকট হয়ে ওঠে হৃদয়ে।

অসম্ভব এক চাপা কষ্ট বুকের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে। যতবার ঘাতক চালকের কারণে সড়ক রক্তে রঞ্জিত হয় ততবারই তার হৃদয়েও রক্তক্ষরণ হয়।

মঙ্গলবার (১৯ মার্চ) রাজধানীর প্রগতি সরণিতে বাসচাপায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবরার আহমেদ চৌধুরী নিহতের ঘটনায় শোকাহত হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এভাবেই নিজের মনে অভিব্যক্তি জানালেন সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী।

তিনি জানান, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিটি মৃত্যু তাকে প্রিয় অর্ণবের কথা মনে করিয়ে দেয়।

তাই না ফেরার দেশে চলে যাওয়া আবরারের উদ্দেশ্যে তিনি বলতে চান, আবরার আর কেউ নয় সে একইভাবে হারিয়ে যাওয়া অর্ণবই।

আজ (বৃহস্পতিবার) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে তারানা হালিমের দেয়া সেই আবেগঘণ স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে দেয়া হলো-

‘বুকের ভেতরে এক অসম্ভব চাপা কষ্ট। ডাক্তাররা বলেন- আনন্দ, বেদনার অনুভূতি বুকের ভেতরে সৃষ্টি হয় না, হয় মস্তিষ্কে।

আমি এত কিছু বুঝতে চাই না- শুধু বুঝি হৃদয়ে ক্রমাগত রক্তক্ষরণ হচ্ছে। যতবার রাস্তায় দুর্ঘটনায় ঘাতক চালকের কারণে রক্তে সয়লাব হচ্ছে রাস্তা- ততবার রক্তক্ষরণ হচ্ছে আমার হৃদয়ে।

আমার বড় বোনের ছোট ছেলে অর্ণব- কি অসম্ভব সুন্দর দেখতে, কি প্রচন্ড হাসি-খুশী, বন্ধু বৎসল, চোখের মণি দুটো স্থির থাকে না কথনও।

আমি এখনও স্পষ্ট দেখতে পাই- ওর হাসি, ওর চঞ্চলতা, ওর দুষ্টমি। দুঃখিত, আমি অর্ণবের বিষয়ে ‘ছিল’ ‘করতো’- এমন অতীত ক্রিয়াপদ ব্যবহার করতে পারবো না।

আমার বাবা-মা মারা যাবার পর, আমার বড় বোন আমার অজান্তেই ‘মা’ হয়ে আমার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

সেই মাসম বড় বোনকে আমি নির্বাক হতে দেখেছি, পাথর হয়ে যেতে দেখেছি, অসুস্থ হতে দেখেছি, বিলাপ করতে দেখেছি।

ষোল সতের বছর বয়সের ছেলেদের দেখার জন্য ফাস্টফুডের দোকানে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতে দেখেছি।

আমার বড় বোন সড়ক দুর্ঘটনায় আকাশের ঠিকানায় চলে যাওয়া তার ছেলেটিকে কত ছেলের চেহারায় যে খুঁজেছে।

কতদিন, কতমাস, কত বছর আমরা সাইফ আহমেদ অর্ণবকে হারিয়েছি জানি না। হিসাব রাখিনি। কারণ প্রতিটি দিনই সেই দিন, যেদিন অর্ণবকে হারিয়েছি।

আমি খালা, আমি বলতে পারি একদিনও কাটেনি এমন যেদিন অর্ণবকে অনন্ত একবার মনে পড়েনি।

অর্ণবের বড় ভাইয়ের, আমার দুটো ছেলের চোখে অর্ণবের জন্য শুন্যতা দেখতে দেখতে বছরের পর বছর কাটছে আমাদের।

বাবা আবরার, আমি কখনো তোমাকে দেখিনি কিন্ত তোমার যে রক্ত বয়ে গেছে জেব্রা ক্রসিং এর উপর, তোমার রক্তে ভেজা আইডি কার্ড সব চেনা আমার ।

বড় চেনা। বড় আপন। পথচারীরা নিয়ম মেনে চললেও জীবন যায় বেপরোয়া চালকের হাতে।

জেব্রা ক্রসিং এ পড়ে থাকা তোমার মৃতদেহই লাগলো তা প্রমাণ করতে? শুধু পথচারীর নিয়ম মানলেই চলবে না, চালকেরও মানতে হবে।

বাস-ট্রাক মালিকদেরও মানতে হবে। সাধারণ মানুষ নিয়ম মানবে আর তারা নিয়ম মানবেন না- এমন সিস্টেম এক প্রহসন।

যে সিস্টেমের অংশ আমি, আমরা সকলেই। আবরার ঠিক জেব্রা ক্রসিংয়ে তোমার মৃতদেহ যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল- ‘আমি নিয়ম মেনেছি,’ ‘দেখুন সকলে আমি জেব্রা ক্রসিং দিয়েই চলেছি’। এ যেন বড় এক প্রশ্নবোধক চিহ্ন।

বড় এক লজ্জা দিয়ে গেল সিস্টেমকে? আর ব্যক্তি আমার কাছে অচেনা আবরার আর চেনা অর্ণব কষ্টে রক্তে একাকার হয়ে গেল।

প্রচন্ড কষ্ট নিয়ে সড়কে হত্যার জন্য দায়ী কয়েকজন ঘাতক চালকের দ্রুত বিচার দেখার অপেক্ষায় রইলাম।’