প্রশ্ন যখন ফাঁস, মেধাবীদের মাথায় বাঁশ

bekarগত ১৯/০৫/২০১৭ ইং অগ্রণী ব্যাংকের “সিনিয়র অফিসার” নিয়োগ পরীক্ষা ছিল। দেশের আনাচে কানাচে থাকা বেকার যুবকেরা ছুটে এসেছিল রাজধানীর বুকে, একটি চাকরির পরীক্ষা দেবার আশায়। সকাল বেলা যারা পরীক্ষা দিয়েছে তারা প্রশ্নসহ উত্তর পেয়েছে পানির দামে (শোনা কথা)। বিকেলবেলা আমি নিজের চোখেই দেখেছি সবাই হাতেহাতে প্রশ্ন ও উত্তর পড়ছে। দেখে হতাশ হবার পরিবর্তে মজাই পেলাম!!!

কারন আমি জীবনে কোনদিন কোনো পরীক্ষার আগাম প্রশ্ন দেখিনি। তাই খুব আগ্রহ নিয়ে দেখছিলাম। হঠাৎ এদের ক্ষমতা কত এই চিন্তাটা মাথায় আসলো। একজনকে ডেকে ভাব জমালাম আর জানতে চাইলাম ভাই প্রশ্ন কত টাকা। উত্তর কমন পড়লে ২০ হাজার। অনেকটা হতচকিয়ে গেলাম!!! পরীক্ষা কেন্দ্রে আর একমুহুর্ত অপেক্ষা না করে লালবাগ কেল্লায় গিয়ে ঐ থানার এক এস আই এর সাথে কিছুটা সময় কাটালাম।বেচারা ভালো মানুষ। আমি ঢাকা কলেজের ছাত্র শুনে তার বুকটা গর্বে ভরে গেল। কারন জানতে চাইলে বলল সে নিজেও ঢাকা কলেজের ছাত্র। পরের সময়টা আর খারাপ কাটেনি।

যাই হোক, কিছুক্ষন পরই দলে দলে পরীক্ষার্থীরা আসতে লাগলো। আমি যদিও আগেই শুনেছিলাম পরীক্ষা বাতিল হয়ে গেছে তবুও এগিয়ে গেলাম। কয়েকজনের সাথে পরিচিত হলাম। প্রচন্ড রোদে সবাই ঘেমে একাকার। সবার চোখে মুখে ক্লান্তি আর বিষাদের ছাপ। অটোতে উঠেছি আজিমপুর বাসস্টান্ডে যাবো। কথা হচ্ছিল ২ জন ছেলে আর একজন মেয়ের সাথে। ওরাও আমার মত ভুক্তভোগী। খুব সহজেই মানিয়ে নিলাম নিজেকে। ৫ টাকার ভাড়া ১০ টাকা চাইতেই সবাই খুব ক্ষেপে গেলো। আজ যে যাত্রীর চাপ বেশি এটা ওরা বুঝতেই চাইলোনা। আমি বললাম ভাই, আপনারা সামনে এগিয়ে যান আমি ওনাকে বিদায় দিচ্ছি। সৌজন্যতা রক্ষা করতে আরো দুজন মানিব্যাগে হাত দিল।আমি থামিয়ে দিলাম।

সবাই যার যার পথ ধরে চলে যাচ্ছি। ২৭ গাড়িতে উঠার আগেই পিছন থেকে একজন ডাক দিলো, শামীম ভাই!!! তার ডাকের মাঝেই আমি স্পষ্ট অসহায়ত্বের সুর পেলাম। থমকে দাঁড়িয়ে বললাম, কি হয়েছে?

ছেলেটি আমার সাথেই অটোরিকশা চেপে এসেছে। বলল ভাই, একটা কথা বলবো কিন্তু খুব লজ্জা লাগছে। আমি বললাম, আরে ভাই লজ্জার কি আছে বলেন সমস্যা নাই। চোখমুখে লাল আভা ফুটে উঠেছে। ঢাকায় পরীক্ষা দেবে তাই রাতের ট্রেনে চড়ে খুলনা থেকে এসেছে। পরীক্ষার হলে মোবাইল নিতে দেয়না তাই সেটাও রেখে এসেছে। আমাকে বলল, ভাই আপনার কাছে যদি টাকা থাকে আমাকে ৩০০ টাকা ধার দেন। আমি বাসায় গিয়েই বিকাশ করে দেবো। আমার কাছে টাকা শেষ হয়ে গেছে। চোখের পানি ছেড়ে দিল। কোন হতভাগা মায়ের সন্তান কে জানে!!! আমি বুঝতে পারলাম সকাল থেকে কিছু খায়নি। বললাম, আচ্ছা সে দেখা যাবে চলুন একটা কলা আর কেক খাই। খাবে না বলছে।

বাড়ি চলে যাবে। আর কোনদিন ঢাকায় আসবেনা। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি মাঝে মাঝেই ঢাকায় আসেন পরীক্ষা দিতে? উত্তর ছিল এইবার দিয়ে ৪০ বার। চাকরির বয়স শেষের দিকে। বিসিএস এর ভাইবা ফেস করেছে দুইবার কিন্তু ব্যাংকে সে টেকে না। কারন প্রশ্ন আগেই ফাঁস হয়ে যায়। ছেলেটা মেধাবী বুঝতে পারলাম।কেক আর কলা খাচ্ছি। টাকাটা দিয়ে বললাম, হবে? সে বলল যে কষ্ট হলেও চলে যাবে। মোবাইল নাম্বার চেয়েছে ভুল নাম্বার দিয়েছি। অবশ্য আমারি নাম্বার যেটা আর ব্যবহার করি না। কারন ও বাড়ি গিয়ে আমার এই সামান্য টাকাটা ফেরৎ দিতে চাইবে তাই। ভাবছেন টাকা দিছি তাই ফেসবুকে লিখে জানান দিচ্ছি। না মশাই, ভুল বুঝবেন না।

আমার কথা হলো কারা সেই মানুষরূপী নরপশু যারা ২৬ লক্ষ বেকারের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে? একজন মেধাবী শতশত রাতের ঘুমকে বিদায় জানিয়ে একটা চাকরির আশায় পড়াশোনা করে। বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মা’কে একটু শান্তিতে রাখবে এটাই তার একমাত্র কামনা। মাথার চুলগুলো সাদা হয়ে যাচ্ছে। প্রিয় মানুষটি বলেই চলেছে, বাবু আমি যে আর পারছিনা। বাবা এবার আর আমাকে রাখবে না। আমি তোমাকে ছাড়া কিভাবে থাকবো তা একদম ভাবতে পারিনা। প্লিজ বাবু, কিছু একটা করো। আমাকে তুমি নিয়ে যাও। আমি আর পারছিনা।

এমন আর্ত কান্নাটাও কখনোবা অসহ্য লাগে। বেকার ছেলেটি বলেই দেয়, আমিতো চেষ্টার কম করিনা। চাকরি না হলে আমি কি করব??? আমারতো মামা খালু নাই, টাকা নাই আমি কিভাবে চাকরি পাবো। তুমি বরং অন্য ছেলেকেই বিয়ে করে ভালো থেকো।

একদিন প্রিয় মানুষটিও চলে যায় অন্যের ঘরে। ঘরের দরজায় খিল লাগিয়ে কাঁদতে থাকে অসহায় ছেলেটি। কাঁপতে থাকে তার অস্থির দেহ। সাথে কাঁপে মহান প্রভুর দরবার। আর অভিশাপ বর্ষিত হতে থাকে রাজনৈতিক নেতাদের ওপর। জাহান্নামের পথ সুগম করে তারা। আর পাপের টাকায় যে দেহ বাঁচিয়ে রাখে তা অগ্নিদগ্ধ হবে নরকের অনলে।

মেধাবীরা আল্লাহর প্রিয় সৃষ্টি তাতে কোনই সন্দেহ নেই। কারন মেধা আল্লাহর ভালবাসার দান।আর তাদের কে বঞ্চিত করে কোটা এবং টাকা দিয়ে গোবর গনেশদের জীবন সাজাতে যারা ব্যস্ত তাদের স্থান জাহান্নাম হোক এটাই কামনা করে লাখো মেধাবী বেকার!!!

কারো কারো ঘরে ফুলের মত বউ বা মেয়ে রয়েছে। অভাগী মেয়েটি হয়তো ধরেই নিয়েছে তার স্বামীকে দিয়ে আর কিছু হবেনা। একজনমের সব স্বপ্ন তার মিথ্যে হয়ে গেলো। বেকার সংসারেও বোঝা। বাবা ও মায়ের মুখের দিকে তাকানো যায় না। অভাব অনটনে দিন যায়। যাদের ঘরে বাবু আছে সে বাবুটিও শিখে নিয়েছে জামাটি ছিড়ে গেলে সেলাই করে পড়তে হয়। সে জানে তার বাবা অন্যদের (কোটাওয়ালা ও টাকাওয়ালা) বাবার মত নয়।

অবুঝ শিশুটি কেঁদেও কাটিয়ে দেয় ঈদের দিনে নতুন জামা না পাওয়ার বেদনা। রাতে বাবাকে চুমু দিয়ে তবুও ঘুমাতে যায়। এমন বেকার মরে যাওয়াই ভালো। বেঁচে থাক যত রক্তচোষা হায়েনার দল। পৃথিবীটা ভরে উঠুক শুধু হায়েনায়!!!

জীবনের ১৫ টি বছর মেসে কেটেছে। বাবার পকেট শুন্য করে পরীক্ষার ফি, বই,খাতা,কলম,পোশাক আর মেসের খরচ চালিয়েছে। এ বয়সে সেই বাবা এত অর্থ ব্যয়ে মানুষ করা ছেলের উপর একটু ভরসা করেতেই পারে। কিন্তু না, ছেলে বড়ই অকর্মা। পৃথিবীর সবাই শুধু দেখলো ছেলেটি অকর্মা। জীবনের গহীনের শব্দটি কেউ শুনতে রাজি নই।

এই দীর্ঘশ্বাস!!! বিচার হবে একদিন। সেদিনের অপেক্ষায় থাকো হে রাজাধিরাজ। তোমার বিচার ভিন্ন হলেও বিধির বিচার ভিন্ন হয়না।

সেদিন যেন বেকারদের জুতো তোমাদের মাথায় তুলে না নিতে হয় সেই দোয়া করি। যদি কোনোদিন ঐ বেকার বিস্ফারণ ঘটে, চাপা অনল জ্বলে ওঠে, সেদিন খুব ভয়ংকর!!! সেদিন ঐ রাজপ্রাসাদ ধুলায় লুটবে। মেধাবীদের ধ্বংস করে কোনো জাতি মাথা তুলে দাড়াতে পাড়েনা। তাই মেধাবীদের মূল্যায়ন করে চাকরি দাও। দেশ বাঁচবে, দেশের মানুষ বাঁচবে।