প্রতি উপজেলায় এমপিওভুক্ত হচ্ছে তিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

govtসাত বছর পর অবশেষে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনার পর এ ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্তে এসেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ইতিমধ্যে দুটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। এমপিওভুক্তির আবেদন গ্রহণ ও যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বুধবার গঠন করা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুটি কমিটি আগামী সোমবার থেকে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে। ওই দিন সকালে রাজধানীর পলাশীর ব্যানবেইস ভবনে কমিটি দুটির যৌথসভা অনুষ্ঠিত হবে।

কমিটি সূত্র জানায়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়তা নিয়ে একটি সফটওয়্যার তৈরি করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে অনলাইনে আবেদন গ্রহণ করা হবে। আগে বিভিন্ন সময়ে করা এমপিওভুক্তি সংক্রান্ত সব আবেদন বাতিল করা হয়েছে। এখন এমপিওভুক্ত হতে ইচ্ছুক সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নতুন করে আবেদন করতে হবে। এতে প্রতিষ্ঠানের বিস্তারিত তথ্য দিতে হবে। আগামী মাস থেকেই আবেদনপত্র গ্রহণ শুরু হবে।

জানতে চাইলে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সমকালকে বলেন, ‘আমরা বসে নেই। স্বীকৃতিপ্রাপ্ত নতুন প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় সব কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।’

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাছাই কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বৃহস্পতিবার সমকালকে বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে মোটামুটিভাবে এক হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার পরিকল্পনা ঠিক করা হয়েছে। কিছু কমবেশি হতেও পারে। প্রথমে প্রতিটি উপজেলায় কমপক্ষে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিক বিবেচনায় নেওয়া হবে। এতে অবশ্য প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যাবে। এরপর নীতিমালা অনুসারে প্রাপ্যতা ও যোগ্যতা বিবেচনা করে এমপিওভুক্তির সুপারিশ করা হবে। এই কর্মকর্তা জানান, যেহেতু এমপিওভুক্তিতে সরকারের বিপুল টাকা ব্যয় হয়, তাই প্রতিটি উপজেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিকেই এমপিওভুক্তির জন্য বেছে নেওয়া হবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সোহরাব হোসাইন বৃহস্পতিবার বলেন, যত দ্রুত সম্ভব বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হবে। তবে কতগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হবে তা এই মুহূর্তে বলা যাবে না। তিনি বলেন, এটা নির্ভর করবে সরকার এ খাতে কত টাকা দিচ্ছে তার ওপর। নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সর্বশেষ এমপিওভুক্ত করা হয়েছে ২০০৯ সালের ১৬ জুন। সেদিন সারাদেশের এক হাজার ৬০৯টি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে (স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি)

এমপিওভুক্তি করা হয়। প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী সে সময়ে সরকারি বেতনের আওতায় এসেছিল। এরপর আর কোনো উদ্যোগ নেই। বর্তমানে সারাদেশের প্রায় সাড়ে সাত হাজার নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নতুন এমপিওভুক্তি দিতে এরই মধ্যে হিসাব-নিকাশ চূড়ান্ত করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ। তাদের হিসাব মতে, সারাদেশের এমপিওবিহীন সাত হাজার ১৪২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্তি করতে বার্ষিক দুই হাজার ১৮৪ কোটি ২৭ লাখ ৫২ হাজার ২৫০ টাকা লাগবে। এর মধ্যে এক হাজার ২২৭টি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জন্য ২১৯ কোটি ৭১ হাজার ৩০০ টাকা, এক হাজার ৮৯টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জন্য ৩৬৮ কোটি ১৫ লাখ ২৭ হাজার ৮৫০ টাকা, এমপিওভুক্ত তিন হাজার ২৭৫টি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে মাধ্যমিকে উন্নীত করে এমপিওভুক্ত করতে ৫২২ কোটি ৬০ লাখ, ৮১ হাজার ২৫০ টাকা, ৫১৮টি উচ্চ মাধ্যমিক কলেজের জন্য ৩৫৭ কোটি ১২ লাখ ৪৭ হাজার ৪০০ টাকা এবং এমপিওভুক্ত এক হাজার ৩৩টি উচ্চমাধ্যমিক কলেজকে ডিগ্রি স্তরে উন্নীত করে এমপিওভুক্ত করতে ৭১৭ কোটি ৩৮ লাখ ২৩ হাজার ৪৫০ টাকা লাগবে।

এই প্রস্তাবে বলা হয়েছে, প্রতিটি ডিগ্রি কলেজ এমপিওভুক্ত করতে বছরে লাগে ৬৯ লাখ ৪৪ হাজার ৬৫০ টাকা, উচ্চ মাধ্যমিক কলেজের লাগে ৬৮ লাখ ৯৪ হাজার ৩০০ টাকা, আর নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের লাগে ১৫ লাখ ৯৫ হাজার ৭৫০ টাকা।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের বাজেট শাখা থেকে জানা গেছে, অপেক্ষায় থাকা সব প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে এমপিওভুক্ত হচ্ছে না। এই মুহূর্তে সারাদেশে এমপিওভুক্তির সব শর্ত পূরণ করে অপেক্ষমাণ রয়েছে পাঁচ হাজার ২৪২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আর এগুলোতে কর্মরত এমপিওভুক্তির যোগ্য শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন প্রায় ৭৫ হাজার। তাদের সবাইকে এক অর্থবছরের বাজেটে এমপিওভুক্ত করা কঠিন। এ জন্য পর্যায়ক্রমে যোগ্য সবাইকে এমপিওভুক্ত করা হবে। এই মুহূর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে এক হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সদ্য জারি করা এমপিও নীতিমালায় জনসংখ্যা অনুপাতে সংশ্নিষ্ট এলাকায় এমপিওর প্রাপ্যতা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে প্রতিষ্ঠানের ভালো ফল, প্রয়োজনীয় শিক্ষার্থী সংখ্যা, শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতাসহ আরও বেশ কিছু শর্ত। এমপিওভুক্ত হতে চাইলে সংশ্নিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব জমি থাকতে হবে। ভাড়া ভবনে একাডেমিক কার্যক্রম চলমান কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কোনোভাবেই এমপিও দেওয়া হবে না। জানা গেছে, ‘নীতিমালা অনুসারে প্রাপ্যতা না থাকলেও দেশের পিছিয়ে পড়া এলাকা, পার্বত্য, চা বাগান, হাওর এলাকাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রত্যেক উপজেলায় কমপক্ষে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করার আশা আছে। এক্ষেত্রে একটি স্কুল, একটি কলেজ এবং একটি মাদ্রাসা তালিকায় স্থান দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সর্বশেষ এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২৬ হাজার ১৮০টি। এর মধ্যে স্কুল ১৬ হাজার ১৯৭টি, কলেজ দুই হাজার ৩৬৫টি, মাদ্রাসা সাত হাজার ৬১৮টি। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন বাবদ সরকার প্রতিমাসে ৯৪১ কোটি ৫০ লাখ ২৪ হাজার ৭১১ টাকা ব্যয় করছে।