নৌকার মনোনয়ন পাচ্ছেন না যেসব হেভিওয়েট আ.লীগ নেতা

ecআওয়ামী লীগের ভিআইপি প্রার্থীদের অনেকেই মনোয়ন ঝুঁকিতে পড়তে যাচ্ছেন। এদের মধ্যে মন্ত্রী, এমপি, কেন্দ্রীয় বা স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী নেতাও আছেন। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এরা মনোনয়নবঞ্চিত হতে পারেন।

বিশেষ করে এলাকায় যারা জনপ্রিয়তা হারিয়েছেন, নিজে বিতর্কিত কর্মকাণ্ড করেছেন অথবা যাদের আত্মীয়স্বজন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছেন, দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছেন তারা মনোনয়ন পাবেন না, এটা প্রায় নিশ্চিত।

এ ছাড়া এলাকাবিমুখ এবং নেতাকর্মী বিচ্ছিন্নদের বেলায়ও এ খড়গ নেমে আসতে পারে। একই আসনে দু’জন প্রার্থীর সব ধরনের যোগ্যতা থাকার পরও একজন বাদ পড়বেন। আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড এমন ইঙ্গিতই দিয়েছে।

ক্ষমতাসীন দলের সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ড এবং নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সংশ্লিষ্ট নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইতিমধ্যে মনোনয়নের খসড়া তালিকা তৈরি হয়েছে। সেখানে অনেক মন্ত্রী এবং প্রভাবশালী নেতার নাম নেই। যা মনোনয়ন ঘোষণার সময়ই চমক হিসেবে দেখা যাবে। তবে, এদের কেউ কেউ কৌশলগত কারণেও বাদ যেতে পারেন।

কেউ হতে পারেন জোট রাজনীতির বলি, আবার একই আসনে একাধিক ভিআইপি থাকার কারণেও মনোনয়নবঞ্চিত হতে পারেন অনেকে। তবে, কে বা কারা বাদ যাচ্ছেন নির্দিষ্ট করে এমন কারও নাম বলতে চায়নি সংশ্লিষ্ট সূত্র।

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য কাজী জাফরুল্লাহর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কিছু আসনে মনোনয়ন পরিবর্তন হবে। তিনি বলেন, আগামী নির্বাচন হবে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক। এ নির্বাচনে যে বা যারা আসন ধরে রাখতে পারবেন বলে মনে করা হবে তারা মনোনয়ন পাবেন। যারা গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছেন সেসব স্থানে মনোনয়ন পরিবর্তন হবে। যাদের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি, নেতাকর্মী বিচ্ছিন্নতা এবং বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়ানোর প্রমাণ পাওয়া যাবে তারা মনোনয়ন না-ও পেতে পারেন।

প্রসঙ্গত, গত ৬ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে দুই মন্ত্রীর কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনা হয়। এতে ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের আত্মীয়স্বজনের অপ্রিয় কর্মকাণ্ডের বিষয় উত্থাপন করেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর সঙ্গে একমত পোষণ করে ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ ডিলুর আত্মীয়স্বজনের অপ্রিয় কর্মকাণ্ডের কথাও স্মরণ করিয়ে দেন।

ডিলুর বিতর্কিত কর্মকাণ্ড, দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতি এবং তার পরিবারের সদস্যদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে সমালোচনা রয়েছে। জমি দখল, নেতাকর্মীদের নির্যাতন করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ধর্মমন্ত্রীর ছেলে মুহিত-উর রহমান শান্ত নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের পর সর্বশেষ দলের একজন নেতাকে খুনের অভিযোগে আসামি হয়েছেন।

ক্ষমতাসীন দলের আরেক প্রেসিডিয়াম এবং সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক এ প্রসঙ্গে বলেন, বড় দলে মনোনয়নকেন্দ্রিক অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা থাকবেই। আওয়ামী লীগ এ দেশের সবচেয়ে বড় দল। অনেকেই মনোনয়ন চাইবে। যিনি যোগ্য, জনপ্রিয় এবং জেতার সামর্থ্য রাখেন তাকেই মনোনয়ন দেয়া হবে। কেননা নির্বাচনে প্রতিটি আসন খুব গুরুত্বপূর্ণ। কোন দল কত আসন পেল তার ভিত্তিতেই সরকার গঠিত হয়। কাজেই আমরা একটা আসনও মনোনয়নের ভুলে হারাতে চাই না।

সূত্র জানায়, উপরোক্ত দুই মন্ত্রীর মতো আরও বেশ কয়েকজন মন্ত্রী মনোনয়ন ঝুঁকিতে আছেন। এদের মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর নির্বাচনী এলাকাসহ দলের অন্যান্য পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা না থাকার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় নেতাকর্মী ও জনগণের সঙ্গে তার যোগাযোগ নেই বলে সাংগঠনিক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে নেতাকর্মী বিচ্ছিন্নতার কারণে তিনি বাদ পড়তে পারেন।

এদিকে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত নিজেই নির্বাচন না করার ঘোষণা দিয়েছেন। তার বয়স হয়েছে। তাছাড়া মনোনয়নের বেলায় শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীও দাঁড়িয়ে গেছে। তার সংসদীয় এলাকা সিলেট সদর আসনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন দলের সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহউদ্দিন সিরাজ। যদিও অর্থমন্ত্রীর ভাই ও জাতিসংঘের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি এমএ মোমেনও এখানে প্রার্থী হতে আগ্রহী।

ঠিক ঝুঁকি বলা না গেলেও গাইবান্ধায় ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়াকে মনোনয়নের জন্য চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মাহমুদ হাসান রিপন। দু’জনকে কেন্দ্র করে রীতিমতো দু’ভাগ হয়ে পড়েছে স্থানীয় সংগঠন।

কেরানীগঞ্জের একাংশ, ঢাকার হাজারীবাগ ও সাভারের একাংশ নিয়ে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামের আসন। এখানে মনোনয়ন চান কেরানীগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীন চাকলাদার। সরকারের খাদ্যমন্ত্রী বেশকিছু ঘটনায় বিতর্কিত হয়েছে। মেয়াদের শেষ সময়ে এসে একটি ঘটনায় বেশ বেকায়দায় পড়েছেন কামরুল ইসলাম। প্রতিটি ঘটনাই সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছে।

মনোনয়ন ঝুঁকিতে আছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আরিফ খান জয়। দলীয় নেতাকর্মী ও সরকারি কর্মকর্তাকে পেটানোসহ রুম ভাংচুরের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। যা সরকারকে খুবই বিব্রতকর অবস্থা ফেলেছে।

শরীয়তপুর-নড়িয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য সাবেক ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী দলে কোণঠাসা। তিনি অসুস্থও। তার স্থানে দলের সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক শামীম প্রার্থী হতে চান। শামীমের দলে এবং এলাকায় অবস্থানও ভালো।

নরসিংদীর রায়পুরা আসনের সংসদ সদস্য সাবেক মন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ (রাজু)। বয়সের কারণে দলে এবং এলাকায় তার তৎপরতা নেই বললেই চলে। জেলার রাজনীতিতে দ্বন্দ্বের কারণে অনেকটা সমালোচিত। জনপ্রিয় মেয়র লোকমান হত্যায় তার দিকে অনেকেই আঙুল তুলেছিলেন। এবার তার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য অ্যাডভোকেট এবিএম রিয়াজুল কবির কাওছার।

দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় অনেক প্রভাবশালী নেতাও রয়েছেন মনোনয়ন ঝুঁকিতে। এদের সবার বিরুদ্ধেই যে বদনাম আছে তা নয়। এলাকায় সবার কাছে গ্রহণযোগ্য, সব সময় নেতাকর্মী এবং এলাকার জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছেন- এতকিছুর পরও মনোনয়নবঞ্চিত হবেন অনেক প্রভাবশালী নেতা। কারণ এক আসনে দু’জন ভালো প্রার্থী থাকলে একজন বাদ পড়বেনই। দু’জনকে এক আসনে মনোনয়ন দেয়ার কোনো সুযোগ নেই।

যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনি চাঁদপুর সদর ও হাইমচর উপজেলা নিয়ে গঠিত চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য। এ আসনে ত্রাণ ও সমাজকল্যাণবিষয়ক সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী দৌড়ঝাঁপ করছেন। এই দুই নেতাকে নিয়ে কেন্দ্রীয় অন্য নেতারাও দুই ভাগে বিভক্ত। কেউ দীপু মনির, আবার কেউ সুজিত নন্দীর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

ঢাকা-১৩ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক। এখানে দলের ঢাকা মহানগর উত্তরের সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান মনোনয়নপ্রত্যাশী। সাদেক খান রীতিমতো নানকের দুর্গে হানা দিচ্ছেন। স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যেও এ নিয়ে বিভেদ তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া এ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবং দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য মকবুল হোসেন এখানে একজন শক্তিশালী প্রার্থী। একজনকে মনোনয়ন দেয়ায় বাদ পড়বেন অন্য দু’জন।
সাতক্ষীরা ২ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য মীর মোস্তাক রবির পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে নানা ধরণের দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া মিনি পাকিস্তান খ্যাত এ আসনে জামায়াত বিএনপির পৃষ্ঠপোষকতাও করেছেন বর্তমান সংসদ। এ আসনের সাধারণ ভোটাররা নতুন মুখ কাউকে দেখতে চাইছেন। এক্ষেত্রে সবার চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন এফবিসিসিআই পরিচালক ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় শিল্প-বাণিজ্য ও ধর্ম বিষয়ক উপ কমিটির সদস্য ড. কাজী এরতেজা হাসান।

আরেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমানও ফরিদপুর-৪ আসন নিয়ে সুবিধাজনক অবস্থায় নেই। তাকে মনোনয়ন নিয়ে অতীতে চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি লিয়াকত শিকদার। এবারও তিনি মাঠে আছেন।

মনোনয়নকেন্দ্রিক দুটি আসনের দ্বন্দ্বে জড়িয়ে আছে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের নাম। তার মূল আসনের (মাদরীপুর-২) এমপি নৌমন্ত্রী শাজাহান খান। আর এখন তিনি যে আসনের এমপি (মাদারীপুর-৩) সেখানে আগে এমপি ছিলেন সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেন। এবার সেখানে মনোনয়ন চাইবেন দলের দফতর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ। এ আসনে নাছিম-আবুল-গোলাপে তৈরি হয়েছে মনোনয়নজট।

আরেক সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক শরীয়তপুর সদরের সংসদ সদস্য। নানা বিতর্ক ও সমালোচনার কারণে তার স্থলে দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য ইকবাল হোসেন অপুর নাম জোরেশোরে আলোচিত হচ্ছে।-ভোরের পাতা