দস্যু বাহরাম রবিন হুড ‘হারকিউলিস’

mohiuddin

কিশোর বয়সে গোয়েন্দা বা অ্যাডভেঞ্চার সিরিজের প্রতি এক ধরনের মোহ ছিল আমার। বিশেষ করে আবুল কাশেম রচিত দস্যু বাহরাম ও রোমেনা আফাজের দস্যু বনহুর সিরিজ পড়তাম গোগ্রাসে গেলার মতো।

আমাদের স্কুলের পাঠাগারে এ দুটি সিরিজের যে কয়টি বই ছিল, তা সবই শেষ করেছিলাম এসএসসির আগেই। পরে নিজ উদ্যোগে ঢাকা থেকে আরও সংগ্রহ করে পড়েছি। অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে দস্যু বাহরাম, দস্যু বনহুরের অভিযান ও তাদের দমনের ঘটনাবলি পাঠ করতে করতে চলে যেতাম ভিন্ন জগতে।

নিজেকে কল্পনা করতাম বনহুর বা বাহরামরূপে। সমাজের খারাপ লোকগুলোকে কী অসীম সাহস ও কৌশল নিয়ে তারা দমন করত, তা জেনে পুলকিত হতাম। ভাবতাম, যদি বাহরাম হতে পারতাম, তাহলে কত দুঃখী মানুষের উপকার করতে পারতাম! কিন্তু খটকা লাগত এক জায়গায়।

এরা খারাপ লোকদের দমন করে সমাজের উপকার করলেও পুলিশ কেন এদেরকে ধরতে তৎপর থাকে? সে বয়সে এটা বোধে আসেনি যে, অপরাধীদের দমনের জন্য রাষ্ট্র আছে। ওটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার একমাত্র এখতিয়ারও রাষ্ট্রের। অন্য কেউ সেটা করতে গেলে তা হবে রাষ্ট্রের আইন লঙ্ঘন, যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

আর সে জন্যই বোধ করি গল্প-উপন্যাসে দস্যু বাহরাম, দস্যু বনহুর, রবিন হুড বা কুয়াশার জন্ম হলেও বাস্তবে তা হয় না। সে রকম কেউ করতে গেলে তাকে সমাজে নায়ক না হয়ে খলনায়ক হিসেবেই চিহ্নিত হতে হয়। সবারই মনে আছে সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলাভাইয়ের কথা।

২০০৩ বা ২০০৪ সালে দেশের উত্তরাঞ্চলে তার আবির্ভাব ঘটেছিল। সে সময় একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে তার সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়েছিল। তাতে কলেজ শিক্ষক সিদ্দিকুল ইসলামের বাংলাভাই হয়ে ওঠার কাহিনী জানা গিয়েছিল।

ওই সময় রাজশাহী অঞ্চলে কথিত সর্বহারা পার্টির সশস্ত্র ক্যাডারদের অত্যাচারে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। সিদ্দিকুল ইসলাম সর্বহারাদের নির্মূল করতে আইন হাতে তুলে নিল। ছদ্মনাম নিল বাংলাভাই।

সর্বহারার দমন হলো ঠিকই, তবে সিদ্দিকুল ইসলাম পরিচিত হলো সন্ত্রাসী হিসেবে। এক সময় বাংলাভাই হয়ে গেলো রাষ্ট্রের চোখে অপরাধী। পরের ইতিহাস সবারই জানা।

এতদিন পরে কথাগুলো মনে পড়ল পত্রিকায় রোমান-গ্রিক ইতিহাসের শক্তিমান দেবতা ‘হারকিউলিস’-এর বাংলাদেশে আগমনের খবর পাঠ করে।

খবরে বলা হয়েছে, অতিসম্প্রতি ধর্ষক হিসেবে অভিযুক্ত ও চিহ্নিত তিন ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যার পর সেই হত্যাকাণ্ডের দায়িত্ব নিয়েছে অজ্ঞাত ব্যক্তি বা ব্যক্তিরা, যারা নিজেদের পরিচয় দিচ্ছে হারকিউলিস হিসেবে।

রহস্যময় এ ঘটনার শুরু ঢাকার আশুলিয়া থেকে। ওই এলাকার এক নারী গার্মেন্ট কর্মীকে গণধর্ষণ ও হত্যা মামলার অন্যতম আসামি রিপনের গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ গত ১৮ জানুয়ারি পুলিশ উদ্ধার করে। নিহতের গলায় বাঁধা ছিল একটি চিরকুট। তাতে লেখা- ‘আমি ধর্ষণ মামলার মূল হোতা।’

এর পর গত ২৬ জানুয়ারি ঝালকাঠিতে উদ্ধার হয় সজল জমাদ্দার নামে এক যুবকের, সেও একটি ধর্ষণ মামলার আসামি। তার গলায় ঝোলানো চিরকুটে লেখা -‘ধর্ষণের কারণে আমার এই পরিণতি।’

ওই ঘটনার ছয় দিন পর গত ১ ফেব্রুয়ারি পুলিশ আরেক যুবকের লাশ উদ্ধার করে পাশের জেলা পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া উপজেলার এক গ্রাম থেকে।

রাকিব মোল্লা নামের সে যুবকও ওই একই ধর্ষণ মামলার আসামি। তার গলায় থাকা চিরকুটে লেখা ছিল- ‘আমি পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়ার…(অমুকের) ধর্ষক রাকিব। ধর্ষকের পরিণতি ইহাই। ধর্ষকরা সাবধান- হারকিউলিস’।

গ্রিক পুরাণে হারকিউলিসের উল্লেখ আছে একজন অসীম শক্তিধর দেবতা হিসেবে। রোমান ইতিহাসে তাকে বলা হয়েছে ‘হারক্লেস’। তবে যে নামেই ডাকা হোক, তার কাজ ছিল দুষ্টের দমন এবং পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা।

এ জন্য সে হত্যা করতেও দ্বিধা করত না। ওই সময় অত্যাচারিত মানুষ তাই হারকিউলিসকে দেবতা জ্ঞানে পূজা করত। এসবই পৌরাণিক কাহিনী। পৃথিবীতে হারকিউলিস নামে আদৌ কেউ এসেছিল কিনা, তার কোনো তথ্য-প্রমাণ এখন পাওয়া যাবে না।

তবে গ্রিক ও রোমান সাহিত্যে হারকিউলিসকে বীরত্বের প্রতীক হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়েছে। সে শক্তিমান ও ন্যায়বিচারক হারকিউলিসের এ আগমনে দেশবাসীর মনে মিশ্র প্রতিক্রিয়ারই সৃষ্টি হয়েছে।

অনেকে মনে করছেন, ধর্ষকদের এভাবে শাস্তি দেওয়া হলে তা দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করবে এবং বিকৃত মানসিকতার লোকগুলো এ ঘৃণ্য অপরাধ করার আগে পরিণতির কথা চিন্তা করবে।

অন্যদিকে অন্যরা বলছেন, সমাজে যে যত বড় অপরাধই করুক না কেন, তার জন্য আইন ও আদালত বিদ্যমান।

অপরাধীদের শাস্তি দিতে পারেন আদালত। তাদের আইনের আওতায় আনার দায়িত্ব রাষ্ট্রের পক্ষে সরকারের। আইন হাতে তুলে নিয়ে আরেকটি অপরাধ সংঘটনের অধিকার কারও নেই।

সাম্প্রতিককালে আমাদের দেশে ধর্ষণ যেন মহামারীর রূপ ধারণ করেছে। প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় দেশের কোথাও না কোথাও এক বা একাধিক নারী ধর্ষিত হওয়ার খবর বেরোচ্ছে। কখনও একক, কখনও দলবদ্ধ দুর্বৃত্তদের লালসার শিকার হচ্ছে অসহায় নারীরা।

শুধু তাই নয়, এই পাশবিকতা থেকে চার-পাঁচ বছরের শিশুরাও রেহাই পাচ্ছে না। বিকৃত যৌন উন্মাদনায় আক্রান্ত এক শ্রেণির অমানুষের পৈশাচিক আনন্দের শিকার হয়ে অনেককে জীবনও হারাতে হচ্ছে। ধর্ষণ এখন দুর্বৃত্তদের প্রতিশোধ নেওয়ার পদ্ধতিতেও পরিণত হয়েছে।

নিজেদের দলকে ভোট না দিলে নারী ভোটারকে শিকার হতে হয় গণধর্ষণের। আবার প্রেমের প্রস্তাবে সাড়া না দিলে একতরফা প্রেমিকের লালসার শিকার হতে হচ্ছে অনেক তরুণীকে। আবার কোথাও দেখা যায়, দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়েও অসহায় নারীর ওপর পাশবিক অত্যাচার চালায় কেউ কেউ।

এক শ্রেণির মানুষের মানসিক বিকৃতি এতটাই নিচে নেমে গেছে যে, এরা একজন নারীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে দ্বিধা করে না। ধর্ষণের প্রকোপ আজ কতটা প্রকট আকার ধারণ করেছে, মাত্র একদিনের পত্রিকার খবরে চোখ বুলালেই তা অনুমান করা যায়।

গত ৪ ফেব্রুয়ারির বিভিন্ন দৈনিকে চারটি ধর্ষণের খবর প্রকাশিত হয়েছে। পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে শিক্ষকের হাতে নিহত হয়েছে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ূয়া এক ছাত্রী। প্রাইভেট পড়ানো শেষে ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে শিক্ষক উমবাচিং হত্যা করে মেয়েটিকে।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার হাওয়ালখালী গ্রামে প্রতিবন্ধী এক মেয়েকে গত ছয় মাস ধরে ক্রমাগত ধর্ষণ করে আসছিল তার প্রতিবেশী এক চাচা। সম্প্রতি গর্ভপাত করানোর ফলে মেয়েটি অসুস্থ হয়ে পড়লে ঘটনা জানাজানি হয়ে যায়।

চাচা আকরাম আলী বর্তমানে সপরিবারে পলাতক। বগুড়ার শেরপুর উপজেলার দড়িমকুন্দ গ্রামে গত ১ ফেব্রুয়ারি রাতে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বাইরে গিয়ে একই গ্রামের লম্পট যুবক ফটিক মিয়ার ধর্ষণের শিকার হয়েছেন তিন সন্তানের জননী।

একই দিনে রাজবাড়ী সদর উপজেলার চরশিবরামপুর গ্রামের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী মাঠে ঘাস কাটতে গিয়ে একই এলাকার দুই যুবক রেজাউল ও মিলন মোল্লার দ্বারা ধর্ষিত হয়েছে।

একদিনের এ ঘটনাগুলো যে কোনো স্বাভাবিক সমাজের চিত্র নয়- সেটা বোধ করি বলার অপেক্ষা রাখে না।

অনেকে বলে থাকেন, অশিক্ষা-কুশিক্ষা থেকেই কিছু মানুষের মধ্যে ধর্ষণের মতো পাশবিক প্রবৃত্তি জন্ম নিয়ে থাকে। কিন্তু যখন স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক দ্বারা ছাত্রীর শ্নীলতাহানি বা যৌন হয়রানির খবর বেরোয়, তখন প্রশ্ন ওঠে- আমাদের সমাজের এত অধঃপতন হলো কী করে!

কোথাও নিরাপদ নেই আজ নারীরা। ঘরে-বাইরে কোথাও নয়। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা চাকরিস্থল- সবখানে তীক্ষষ্ট নখর উঁচিয়ে নরপিশাচরা যেন ওঁৎ পেতে আছে! এমন পরিবেশে নারীরা কি স্বস্তিতে বসবাস করতে পারে?

ধর্ষকদের বিরুদ্ধে অজ্ঞাত হারকিউলিসের অভিযান প্রশ্ন তুলেছে সচেতন মহলে। কে সে বা কারা তারা, যারা আইন হাতে তুলে নিচ্ছে? এ সম্পর্কে গত ৪ ফেব্রুয়ারি সমকালে ‘হারকিউলিস রহস্যের নতুন মোড়’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- হারকিউলিস নামের নেপথ্যে কারা আছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে ঝালকাঠির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেন বলেছেন, এর পেছরে কারা আছেন, তা বের করতে নিবিড় তদন্ত চালানো হচ্ছে।

খুব শিগগিরই এর ক্লু উদ্ঘাটন সম্ভব হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেছেন। পুলিশ কবে এ রহস্যের উদ্ঘাটন করবে, আমরা জানি না। তবে এর পেছনে কারা আছে, তা অবশ্যই বের করা দরকার।

ধর্ষক নিধনের বাতাবরণে কেউ যাতে শত্রুতা থেকে উদ্ধারে তৎপর হয়ে নিরীহ মানুষকে হত্যার সুযোগ নিতে না পারে, তা নিশ্চিত করা পুলিশ তথা রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব। ধর্ষণসহ যে কোনো অপরাধীর শাস্তি প্রতিটি মানুষেরই কাম্য। তবে তা হতে হবে আইনি প্রক্রিয়ায়।

এক সময় আমাদের দেশে নারীর শরীরে এসিড নিক্ষেপের প্রবণতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল। প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে বা অন্য কোনো শত্রুতাবশত এক শ্রেণির উন্মত্ত লোক এ অপকর্মটি করত।

এখন সে প্রবণতা অনেকটাই কমে এসেছে। এর মূল কারণ এসিড নিক্ষেপের অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে কঠোর আইন প্রণয়ন এবং তা কার্যকর করা।

ধর্ষণের ক্ষেত্রেও সে ধরনের আইন জরুরি ভিত্তিতে করা দরকার বলে সচেতন ব্যক্তিরা মনে করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চতুর্থবার দায়িত্ব গ্রহণ করে বেশ কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছেন।

দুর্নীতি-মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন। দেশবাসী এতে আশাবাদী। তারা এটাও আশা করে, নারীর সল্ফ্ভ্রম ও জীবন রক্ষার জন্যও তিনি তার কঠোরতা প্রয়োগ করবেন। তার সে কঠোরতা বাংলাদেশকে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার জন্য নির্ভয় বিচরণভূমিতে পরিণত করতে পারে।

সূএঃসমকাল