খাবার স্যালাইন হতে পারে মৃত্যুর কারণ!

khabar_salainএখন বর্ষা মৌসুম চলছে। এ সময় বেড়ে যায় বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের প্রকোপ। যার মধ্যে প্রধান ‘ডায়রিয়া’। ডায়রিয়ার পানি ও লবণশূন্যতা থেকে বাঁচতে খাবার স্যালাইনের বিকল্প নেই। কিন্তু হাসপাতালে অধিকাংশ রোগীদের ক্ষেত্রে আমরা দেখে থাকি সঠিক নিয়মে খাবার স্যালাইন বানানো হচ্ছে না। সঠিক নিয়মে খাবার স্যালাইন না বানালে তা মারাত্মক ফল বয়ে আনতে পারে। এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। রোগীদের মাঝে একটা সাধারণ ধারণা আছে যে, স্যালাইন যত ঘন হবে তত বেশি ভাল কাজ করবে।

অনেকেই গরমে ক্লান্ত হয়ে এসে স্যালাইন খান কিন্তু তা সঠিক নিয়মে বানানো হচ্ছে না। আবার ডায়রিয়ার রোগীরা মনে করেন, যত বেশি পাতলা পায়খানা হবে তত ঘন স্যালাইন খেতে হবে। এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। এতে রোগীরা উল্টো নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি ডেকে আনেন। প্রিয় পাঠক, যদি আপনিও এমনটা মনে করে থাকেন তবে এখনই সাবধান হোন এবং সঠিক নিয়মে স্যালাইন বানানোর পদ্ধতিটি শিখে নিন। স্যালাইন বানানোর সঠিক নিয়ম: স্যালাইন বানানোর সঠিক নিয়ম নিয়ে তৈরি বিপাশা হায়াতের সেই অ্যাডের কথা নিশ্চয়ই সবার মনে আছে। হ্যাঁ পাঠক, স্যালাইন বানাতে হবে প্যাকেটে লেখা নিয়ম দেখে। আধা লিটার পানিতে ১ প্যাকেটের পুরো ওরস্যালাইন মেশাতে হবে, এর চেয়ে বেশি বা কম না। এছাড়া মনে রাখবেন, কখনই গরম পানিতে স্যালাইন বানাবেন না।

পানি ফুটিয়ে ঠাণ্ডা করে তারপর স্যালাইন মেশাবেন। তা না হলে জীবন রক্ষাকারী স্যালাইন হয়ে যেতে পারে মৃত্যুর কারণ। বানানো স্যালাইন ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত ভালো থাকে, এরপরে খাওয়ার অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে। ১২ ঘণ্টা পরে স্যালাইন খাওয়ার প্রয়োজন হলে একই পদ্ধতিতে নতুনভাবে বানিয়ে নিতে হবে। ভুল পদ্ধতিতে স্যালাইন বানানো কেন ভয়ঙ্কর? খাবার স্যালাইনে উপাদানগুলো এমনভাবে থাকে যেন তা আমাদের শরীরের ঘনত্বের সাথে মিলে যায়। একে আইসটনিক দ্রবণ বলে। এর ফলে শরীরের পানি শূন্যতা পূরণ হয়। কিন্তু কেউ যদি নিয়ম না মেনে বেশি ঘন করে স্যালাইন বানান তবে তা হাইপারটনিক হয়ে যাবে, স্যালাইনের ঘনত্ব শরীরের ভেতরের তরলের ঘনত্বের চেয়ে বেশি হয়ে যাবে। এই ঘন স্যালাইন খাওয়ার ফলে কোষের ভেতরের যে পানি আছে তা সমতার জন্য কোষের বাইরে চলে আসবে। এতে করে শরীর আরও পানি হারাতে থাকবে এবং ডায়রিয়া বেড়ে পানিশূন্যতা আরও বেশি হবে।

ঠিক যেমন সাগরের পানি খেয়ে তৃষ্ণা আরও বেড়ে যায় কারণ সাগরের পানিও হাইপারটনিক। তাই এই স্যালাইন পানিশূন্যতা পূরণের চেয়ে তা আরও বাড়িয়ে দেবে যার ফলে একজনের মৃত্যুও হতে পারে। আমরা হাসপাতালে এমন প্রচুর রোগী পাই যারা এভাবে ডায়রিয়া আরও বাড়িয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হন। অন্যদিকে যদি স্যালাইন কম ঘনত্বের হয় অর্থাৎ পরিমাণের চেয়ে বেশি পানিতে স্যালাইন তৈরি করা হয় তবে এটিও আমাদের শরীরের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠবে। কেননা এই দ্রবণ হয়ে যাবে হাইপোটনিক যার ঘনত্ব শরীরের তরলের চেয়ে কম। এতে সমতার জন্য লবণ বাইরে রেখে বেশি বেশি পানি কোষে চলে যাবে। এই সমতায় কোষ ফুলে উঠে নষ্ট-ও হয়ে যেতে পারে।

পানিশুন্যতায়/ ডায়রিয়ায় করণীয়:

১। সঠিক নিয়মে খাবার স্যালাইন/ রাইস স্যালাইন তৈরি করুন। অবশ্যই প্যাকেটের নিয়ম অনুযায়ী পানি ও স্যালাইন মেশাবেন। কম বা বেশি মেশাবেন না।

২। রোগীকে বারে বারে বেশি বেশি খাবার স্যালাইন খাওয়ান।

৩। স্বাভাবিক সকল খাবার খেতে দিন। গরম গরম টাটকা খাবার খাওয়ান। বাইরের জুস বা আখের রস ইত্যাদি পরিহার করুন। বাচ্চা যদি বুকের দুধ খায়, কখনোই তা বন্ধ করবেন না।

৪। অনেকে খাবার বন্ধ করে দেন পায়খানা বেশি হবে বলে। যা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। বেশি বেশি খাবার রোগীকে দ্রুত সুস্থ করে তোলে। তাই পারলে রোগীকে বেশি বেশি পুষ্টিকর খাবার খাওয়ান।

৫। অনেকের ধারণা স্যালাইন খাওয়ালে ঠাণ্ডা লাগে। এটিও সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। পানিশূন্যতার সময়ে রোগীর একমাত্র বাঁচার উপায় হলো বেশি বেশি খাবার স্যালাইন খাওয়া।

৬। ডায়রিয়াতে পেটে ব্যথা হওয়া স্বাভাবিক। এজন্য অনেকে এসিডিটির ওষুধ খেয়ে থাকেন। কিন্তু সত্যি বলতে এর ফলে অনেকক্ষেত্রেই ডায়রিয়া বেড়ে যেতে পারে।

৭। ডায়রিয়া সেলফ লিমিটিং অর্থাৎ নিজে নিজে ভাল হয় অধিকাংশ ক্ষেত্রে। তাই পানিশূন্যতা পূরণ করা ছাড়া অন্য ওষুধ সাধারণত দরকার হয় না। তাই স্যালাইনকেই একমাত্র জীবন রক্ষাকারী ওষুধ জেনে রাখুন।

৮। একান্তই কোনো ওষুধ খাওয়ার প্রয়োজন হলে অবশ্যই একজন রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

কখন হাসপাতালে নেবেন?

১। ৬-৮ ঘণ্টা প্রস্রাব না হলে।

২। পানিশূন্যতা খুবই বেড়ে গেলে।

৩। দুর্বলতার কারণে খাবার স্যালাইন খেতে না পারলে।

৪। রোগী পানিশূন্যতায় শকে যাবার উপক্রম হলে।

মনে রাখবেন: ডায়রিয়া রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করার পরে শিরায় স্যালাইন দিলেও খাবার স্যালাইন খাওয়া বন্ধ করা যাবে না এবং অবশ্যই তা সঠিক নিয়মে বানিয়ে খাওয়াতে হবে।