এবার ৭৫ ভুয়া হেডমাস্টার সনাক্ত

govtযশোরে প্রাইমারি সেক্টরের বিভিন্ন স্তরে শক্তিশালী জালিয়াত চক্র কাজ করছে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে উপজেলা পর্যন্ত এদের দৌরাত্ম্য। এই জালিয়াত চক্র লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে বিধি বহির্ভুতভাবে ৭৫ জনকে প্রধান শিক্ষক করেছে। এ নিয়ে তদন্ত হওয়ার পরও প্রায় সবাই এখনও পর্যন্ত স্বপদে বহাল রয়েছেন।

৭৫ জনের মধ্যে তিনজন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পদোন্নতির কাগজপত্র জালিয়াতি করে প্রধান শিক্ষক হয়েছেন। যা তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। এরপরও বহাল তবিয়তে রয়েছেন এসব ভুয়া হেডমাস্টার। অন্যরা জালিয়াতি করেছেন সার্টিফিকেট নিয়ে। তিনটি পরীক্ষার মধ্যে দু’টিতে তৃতীয় বিভাগ থাকার পরও প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। যা বিধি বহির্ভুত। সরকারি বিধি অনুযায়ী একটির বেশি তৃতীয় বিভাগ থাকলে তিনি কোনোভাবেই প্রধান শিক্ষক হতে পারবেন না।

দীর্ঘ অনুসন্ধানে জানাগেছে, ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিদ্যালয়-১ অধিশাখা সারাদেশে সাতজনকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে পদোন্নতি দেয়। যার স্মারক নম্বর ৩৮.০০৭.০০.০০.০০২.২০১৫-২৪৪৮। ওই পত্রে উপসচিব নুজহাত ইয়াসমিনের স্বাক্ষর ছিল। ওই সময় যাদেরকে পদোন্নতি দেয়া হয়েছিল তারা হচ্ছেন, শরীয়তপুর জেলার গোসাইরহাটি উপজেলার লক্ষীপুর ঢালীরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাসুদা পারভীন, সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বধূরডাঙ্গা শিবপুর সোনার বাংলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্রজেন্দ্র নাথ সরকার, কালিগঞ্জ উপজেলার বারদহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের রহিমা পারভীন, পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলার দক্ষিণ কলতা প্যাদাবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের রেজাউল করিম, ঝালকাটি সদর উপজেলার শাখাগাছি পল্লী উন্নয়ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সমিরন বড়াল, ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ২০ নং হামিদপুর নিম্ন মাধ্যমিক সংলগ্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শামসুল আলম ও ভোলার চরফ্যাশনের ৫৬ নং পূর্ব মাদ্রাজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আলমগীর হোসেন।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, উল্লেখিত স্মারকের পত্রটি টেম্পারিং করে যশোরের শক্তিশালী জালিয়াত চক্রটি তিনজনের নাম অন্তর্ভুক্ত করে ১০ জনের পদোন্নতি হয়েছে বলে জানায়। যে তিনজনকে জালিয়াতি করে ওই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় তারা হচ্ছেন, কেশবপুরের রামচন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নার্গিস পারভীন, গৃধরনগর শ্রীরামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হাজিরা খাতুন ও নেহালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এমএম মশিউর রহমান। এই তিনজনের নাম জালিয়াতি করা পত্রের ৬,৭ ও ৮ নম্বর সিরিয়ালে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কেশবপুরের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মিরাজুল আশরেকিন কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে এই তিনজনকে প্রধান শিক্ষক বানিয়ে বেতন পাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। তার সাথে ছিল জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের আরো কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী। যারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে।

অনুসন্ধানে জানাগেছে, সহকারী শিক্ষক পদে সাত বছরের অভিজ্ঞতা না থাকলে কেউ প্রধান শিক্ষক হতে পারবেন না। অথচ নার্গিস, হাজেরা ও মশিউরের সাত বছরের অভিজ্ঞতা ছিল না। তারপরও তাদের নামের প্রস্তাব শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠানো হয়। কিন্তু শিক্ষা অধিদপ্তর যাচাই করে তাদেরকে পদোন্নতি না দেয়ায় জালিয়াতির আশ্রয় নেয় লাখ লাখ টাকা হাতানো কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। দেড় বছর পর বিষয়টি ফাঁস হয়ে যায়। ফাঁস হওয়ার পর শুরু হয় তোলপাড়। সেই সময় জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করে। তদন্ত কমিটিতে ছিলেন সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আমজাদ হোসেন, সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার জামাল হোসেন ও কেশবপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আকবর হোসেন। এই কমিটি ২০১৭ সালের ২৮ আগস্ট প্রতিবেদন দাখিল করে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনজন শিক্ষক তদন্তের সময় জানিয়েছেন, ভারপ্রাপ্ত উপজেলা শিক্ষা অফিসার মিরাজুল আশরেকিন (বর্তমানে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে কর্মরত) তাদের কাছ থেকে খরচ বাবদ কিছু টাকা নিয়ে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি ও বেতন পাওয়ার খবর দেন। ওই সময় জালিয়াতি করা পত্রও তাদের দেখান। তদন্ত প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, ‘কিভাবে এ সকল শিক্ষকের পদোন্নতির প্রস্তাব মহাপরিচালক, বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ ইউনিট, শিক্ষা ভবন ঢাকাতে প্রেরণ করা হয়েছে তার ফরওয়ার্ডিংয়ের কপি উপজেলা শিক্ষা অফিস, কেশবপুরে পাওয়া যায়নি।

উপজেলা শিক্ষা কমিটির ০১.০৭.২০১২ তারিখের সভায় নার্গিস পারভিনের প্রধান শিক্ষকের স্কেল প্রদানের সুপারিশ করা হয়। অপর দু’জনের সুপারিশ সংক্রান্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। দু’টি পত্র যাচাই করে মনে হয়েছে মূলপত্রকে টেম্পারিং করে তিনজন শিক্ষকের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিষয়টি অধিকতর যাচাইয়ের জন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টিগোচর করা প্রয়োজন। অভিযুক্ত তিনজন ছাড়াও আরো ২১ শিক্ষকের পদোন্নতি নিয়ে সমস্যা রয়েছে।’

অনুসন্ধানে জানাগেছে শুধুমাত্র কেশবপুরে জালিয়াতি করে ২৮ জন শিক্ষক প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। বিধি অনুয়ায়ী এসএসসি ও এইচএসসির দুটোতে তৃতীয় বিভাগ এবং সহকারী শিক্ষক হিসেবে সাত বছরের অভিজ্ঞতা না থাকলে প্রধান শিক্ষক হওয়া যাবে না। এরপর জালিয়াতি করে যারা হয়েছেন তারা হচ্ছেন, সাগরদত্তকাটি স্কুলের হাসান আলী, কালিয়ার ই স্কুলের মতিয়ার রহমান, জাহানপুর উত্তরপাড়ার রেজাউল হক, বরণডালী আদর্শ স্কুলের রমজান আলী, রেজাকাটির মিজানুর রহমান, গৌরিঘোনা ইন্দ্রমতির অরুণ কুমার দে, কাশিপুরের ফারুক আহম্মেদ, ঘাড়িয়াঘোপের মোবারেক আলী, কুশলদিয়ার মতিয়ার রহমান, কোমরপুর আদর্শের রমা রানী সরকার, বেলকাটির বিল্লাল হোসেন, চালিতাবাড়িয়ার স্বপন কুমার দে, রামকৃষ্ণপুরের শামছুর রহমান, বেতীখোলার শহিদুল ইসলাম, ত্রিমোহিনীর শামছুন্নাহার, লালপুরের শের আলী, পাত্রপাড়ার আমির হোসেন, ভোগতী নরেন্দ্রপুরের নুরুন্নাহার পারভীন, বিদ্যানন্দকাটির মাহাবুবুর রহমান, চাঁদডাঙ্গী শ্রীফলার সেলিনা খানম, গোপালপুরের আয়ুব হোসেন, কাশিমপুরের সন্তোষ কুমার দাশ, কালীচরণপুরের রঞ্জিত কুমার পাশারী ও বাউশলা পূর্বপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আবুল হোসেন। এদের বাইরে জেলার অন্যান্য উপজেলায় আরো ৪৭ জন ভুয়া প্রধান শিক্ষক রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
যশোরে ভুয়া শিক্ষকের ছড়াছড়ির বিষয়টি ফাঁস হলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে খুলনা অঞ্চলের উপ-পরিচালক অলিউল ইসলামকে তদন্তের নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু তদন্ত করার আগেই তিনি অধিদপ্তরে বদলি হওয়ায় সবকিছু থমকে যায়। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার শেখ অহিদুল আলম শনিবার গ্রামের কাগজকে জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে উপ-পরিচালক অলিউল ইসলাম এ ঘটনার তদন্তে আসবেন।

কথা হয় জালিয়াতি করে পদোন্নতি নেয়া শিক্ষক নার্গিস বেগম, হাজেরা খাতুন ও মশিউর রহমানের সাথে। তারা বলেন, ‘আমরা কিছুই জানিনা। উপজেলা শিক্ষা অফিসার মিরাজ আশরেকিন আমাদের ডেকে নিয়ে পদোন্নতির খবর জানান।’ এ বিষয়ে জানতে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে কর্মরত মিরাজ আশরেকিনকে বার বার ফোন এবং এসএমএস দিলেও তিনি সাড়া দেননি।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার শেখ অহিদুল আলম বলেন, ‘দায়ী যেই হোক না কেন তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’–গ্রামের কাগজ