এবার চিনির বিনিময়ে মুক্তিযোদ্ধা সনদ

muktijoddhaখাদ্য সহায়তা হিসেবে বাংলাদেশকে ২ লাখ টন চিনি অনুদান দেওয়ার আগ্রহ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বরাবর চিঠি দিয়েছে ওমানভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান। ওই পরিমাণ চিনির দাম বর্তমানে হাজার কোটি টাকার বেশি। তবে ওই সহায়তা পেতে হলে বাংলাদেশের এক নাগরিককে মুক্তিযোদ্ধা সনদ দিতে হবে। একই সঙ্গে ওই ব্যক্তির নামে তার বাড়িটি নামজারি করে দিতে হবে।

বাংলাদেশি ওই নাগরিকের নাম খলিলুর রহমান। তিনি মিরপুর মাজার রোডের থার্ড কলোনির বাসিন্দা। মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট ও বাড়ির নামজারির শর্ত জুড়ে দিয়ে খলিলুর রহমান ওমানভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটির চিনি অনুদান দিতে আগ্রহ প্রকাশ করা চিঠিটি প্রধানমন্ত্রী বরাবর পাঠিয়েছেন। ওমানভিত্তিক আহমেদ খালফান মান আল’মিরি ওয়াবনথ এলএলসির পক্ষ থেকে প্রায় এক বছর আগে আহমেদ খালফান আল মামরি বিনামূল্যে ২ লাখ টন চিনি দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন।

বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বাংলাদেশের খবরকে এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তারা ধারণা করছেন, ওমানভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে বাংলাদেশের ওই নাগরিকের বিশেষ সুসম্পর্ক আছে। তবে এ ধরনের প্রস্তাবের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন কর্মকর্তারা। তারা বলেন, কেউ যদি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে থাকেন এবং এর সপক্ষে প্রয়োজনীয় প্রমাণাদি থাকে তাহলে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে তিনি নিয়মানুযায়ী আবেদন করবেন। সে অনুযায়ী মন্ত্রণালয় তার সিদ্ধান্ত জানাবে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে অংশ না নিয়েই যদি কেউ অনুদান বা অন্য কোনো শর্তে মুক্তিযুদ্ধের সনদ দাবি করেন, সেটা হাস্যকর ও অবাস্তব।

শিল্প সচিব মোহাম্মদ আবদুল্লাহ বাংলাদেশের খবরকে জানান, ২ লাখ টন চিনি অনুদান দিতে বাংলাদেশের এক নাগরিক মুক্তিযোদ্ধা সনদ ইস্যু এবং তার বাড়ির নামজারির শর্ত দিয়েছেন। ওমানভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে বাংলাদেশের ওই নাগরিকের সুসম্পর্ক থাকতে পারে। এর বেশি আর কোনো তথ্য তিনি দিতে পারেননি।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বাংলাদেশের খবরকে আরো বলেন, বিরোধপূর্ণ কিংবা অন্যের দখলে থাকা বা মামলা রয়েছে এমন কোনো জায়গা যদি সেটি হয়ে থাকে, তাহলে কীভাবে তা একজনের ইচ্ছানুযায়ী তার নামে নামজারি করা যাবে সেটি বোধগম্য নয়।

খলিলুর রহমানের সঙ্গে মিরপুরের ঠিকানায় যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করে জানান, প্রায় এক বছর আগে ওমানের ওই ব্যবসায়ী আমার কাছে বাংলাদেশকে বিনামূল্যে ২ লাখ টন চিনি দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। আমার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে এ বিষয়ে তিনি চিঠিও লেখেন। আমি এখানে মিডিয়া (মাধ্যম) হিসেবে কাজ করছি।

চিনি অনুদানের প্রস্তাব বিষয়ে খোঁজ-খবর নিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি বাণিজ্য সচিব শুভাশিষ বসুর সভাপতিত্বে বৈঠক হয়। এতে টিসিবির চেয়ারম্যান, ট্যারিফ কমিশন, শিল্প মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়, চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। আর ১৫ মার্চ ওই বৈঠকসংক্রান্ত কার্যবিবরণী তৈরি করা হয়।

বৈঠকে ওমানের ওই প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। একই সঙ্গে প্রস্তাবে বেশ কিছু বিষয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে বলেও মত প্রকাশ করা হয়। বৈঠকে টিসিবি চেয়ারম্যান বলেন, ওমানের প্রতিষ্ঠানটির রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেটের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। এ ছাড়া পুরুষদের বিউটি সেলুন চালানো প্রতিষ্ঠানটির মূল ব্যবসা। এ অবস্থায় প্রতিষ্ঠানটির চিনি দেওয়ার প্রস্তাব আরো যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন। তিনি আরো বলেন, টিসিবির পক্ষে ৪ থেকে ৫ হাজার মেট্রিক টন চিনি নেওয়া সম্ভব হবে। এর বেশি নিলে গুদাম ভাড়া করতে হবে। এ ছাড়া প্রতিশ্রুত চিনির উৎপাদন কাল ও খাদ্যমান সম্পর্কে প্রস্তাবে কোনো তথ্য নেই, যা অত্যন্ত জরুরি।

ট্যারিফ কমিশনের প্রতিনিধি বৈঠকে বলেন, ২ লাখ টন চিনি আসলে বাজারে এর ব্যাপক প্রভাব পড়বে। কম মূল্যে বিক্রি করা হলে চিনি পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আপত্তি করতে পারে।

ওই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে পরিপূর্ণ তথ্য পেতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ওমানে বাংলাদেশি দূতাবাস ও বাংলাদেশে অবস্থিত ওমান দূতাবাসে চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ওই বৈঠকে। এ ছাড়া ট্যারিফ কমিশন ও টিসিবির পাশাপাশি ওমান দূতাবাস থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও মতামত পাওয়ার পর ওই চিনি বিষয়ক সার্বিক অগ্রগতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে জানানোর সিদ্ধান্ত হয়।

ওমানভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি আরো দুটি শর্ত দিয়েছে। এর একটি হচ্ছে, বাজার মূল্যের চেয়ে কম দামে ওই চিনি বিক্রি করতে হবে। অন্যটি হচ্ছে, দাতা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বাংলাদেশে আগমন, অবস্থান ও আপ্যায়নের খরচ বাংলাদেশ সরকারকে বহন করতে হবে।

বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) একজন কর্মকর্তা জানান, প্রতি লাখ টন চিনির বর্তমান বাজার মূল্য ৫০০ কোটি টাকারও বেশি। এ হিসাবে ২ লাখ টন চিনির দাম ১ হাজার কোটি টাকার বেশি। যারা ১ হাজার কোটি টাকার চিনি বিনামূল্যে দিতে চায়, সে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের আগমন ও আপ্যায়ন ব্যয় বাংলাদেশকে বহন করার শর্ত অযৌক্তিক বলেই মনে হচ্ছে।

খলিলুর রহমানের প্রতিবেশীদের কাছ থেকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিনি মূলত একজন আদম ব্যবসায়ী। মাঝেমধ্যেই পাওনাদাররা তাগাদা দিতে তার বাসায় আসেন। তিনি যে বাড়িতে থাকেন, তার কাগজপত্র নিয়েও সমস্যা রয়েছে। বাড়িটির নামজারি এখনো হয়নি।

খলিলুর রহমান নিজেকে সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ও মুক্তিযোদ্ধা বলে দাবি করেন। মিরপুর মাজার রোডের তৃতীয় কলোনিতে তার দোতলা বাড়ি রয়েছে, যার নামফলকেও সেনাবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় লেখা।

সরেজমিন তার মিরপুরস্থ বাসায় গেলে খলিলুর রহমান বাংলাদেশের খবরকে বলেন, আমি ওমানে লোকজন পাঠাই। তাবলিগ জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত। সেই সূত্রে ওমানের ওই ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগাযোগ। তবে এ যোগাযোগ শুধুমাত্র ই-মেইল ও হোয়াটস অ্যাপ সূত্রে। এ সহায়তার সঙ্গে আপনার স্বার্থ কী- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাকে অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ওমানের ওই ব্যবসায়ী। এখানে বিষয়টি খুবই স্পষ্ট। আমি কাজ করছি কিছু অর্থের জন্য। আমি প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখেছি, আমি মুক্তিযোদ্ধা, তবে সনদ পাইনি। এখন আপনি (প্রধানমন্ত্রী) আমাকে এ সনদ দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেবেন। আমি এত বড় একটি সহায়তার ব্যবস্থা করছি, সে হিসেবে এটি আমার প্রাপ্য। আমার বাড়ির নামজারিও করে দিতে হবে।

মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট ও বাড়ির নামজারির শর্ত ওমানের ব্যবসায়ীর কি না- এ প্রশ্নের জবাবে খলিলুর রহমান বলেন, এটি আমার শর্ত।

এতদিন মুক্তিযোদ্ধা সনদ সংগ্রহ না করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি এক নম্বর সেক্টরের অধীনে মুক্তিযুদ্ধ করেছি। কিন্তু সনদ পাইনি। সনদ পেতে হলে ঘুষ দিতে হয়। ঘুষ দিয়ে সনদ নেব না।