মর্গে গোসল করানোর সময় নুসরাতের চোখে-মুখে যেন আল্লাহর নূর ভেসে উঠছিল

nusrat (4)

কোটি মানুষের প্রার্থনা ব্যর্থ করে দিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি।

অগ্নিদগ্ধ মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি মারা গেছেন। বুধবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে তিনি মারা যান।

তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেন ঢামেক বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের চিকিৎসক অধ্যাপক রায়হানা আওয়াল।

ফেনীর অগ্নিদগ্ধ শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিয়ার নিথর শরীরে হাত বুলিয়ে শেষ স্নেহ আর ভালোবাসা দিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) মর্গের তিন নারী।

n

বৃহস্পতিবার ঢামেক মর্গে লাশের ময়না তদন্তের পর নুসরাতের শরীরে স্নেহের পরশ বুলিয়ে গোসল দিয়েছেন চাঁন বিবি, মনি বেগম আর আনসারী বেগম নামের এই তিন নারী।

দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে বাবা ও স্বজনদের কাছে নুসরাতের লাশ হস্তান্তরের পর একটি দৈনিকে একান্ত আলাপচারিতায় এই তিন নারী জানালেন কিভাবে তারা মাতৃস্নেহের পরম আদরে শেষ গোসল দিয়েছেন নুসরাতকে।

নুসরাতের মায়াবী চোখ-মুখ আর চাহনীর বর্ণনা দিতে গিয়ে বারে বারে আঁচলে চোখ মুচছিলেন চাঁন বিবি।বলছিলেন, এমন নির্দয় মানুষ পৃথিবীতে আছে?

এমন নিষ্পাপ মেয়ের শরীরে আগুন দিয়ে হত্যা কেউ করতে পারে? মনি বেগম বলছিলেন, নুসরাতের পোড়ে যাওয়া শরীরের কথা।

nusrat

বুক এবং গলার নিচ থেকে পুরো শরীরই পুড়ে গেছে। ‘মেয়েটার পেটে কোনো মাংস নেই, মুখ দিয়ে লালা ঝরছে, যৌনাঙ্গ পুড়ে বীভৎস অবস্থা, পায়ের নখের লাল টুকটুকে মেহেদী রঙটুকু এখনো চোখে পড়ে।’

গলার নিচের দিকেই ক্ষত ছিল বেশি। পিঠের কিছু অংশও পুড়ে ক্ষত হয়েছে।

‘রাফির মা ভীষণ অসুস্থ গতকাল রাত থেকে , মেয়ে মারা যাওয়ার পর শেষবার একটু দেখতেও পারেননি।

আনসারী বেগম বর্ণনা দিয়েছেন নুসরাতের মুখের। ‘আহ! কি সুন্দর মেয়ে! চোখে মুখে যেন আল্লাহর নূর ভেসে উঠছিল।

nusrat (3)

পুরো শরীরে পোড়া আর ক্ষতের চিহ্ন থাকলেও মুখে কোনো আচড়ও লাগেনি। মনে হয়েছে যেন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে নুসরাত।’

তারা তিনজনই জানান, ‘আমরা পেপার পত্রিকা পড়ি না। তবে ডাক্তার স্যার আর সিস্টার আপাদের কাছে নুসরাত সম্পর্কে আগে থেকেই শুনেছি।

নুসরাতের জন্য দোয়াও করেছি। আল্লাহর কাছে বলেছি, মেয়েটি যেন বেঁচে যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চলেই গেল নুসরাত।

’এদিকে নুসরাতের লাশ দেখতে সকাল থেকেই মর্গে ভিড় করেন তার স্বজনরা। স্বজনদের বাইরেও অনেকে আসেন মর্গের সামনে।

nusrat

মিরপুর থেকে সকালেই মর্গের সামনে এসে দাঁড়িয়ে ছিলেন শায়না নামের এক গৃহিণী।

নুসরাত তার কেউ না, তার সাথে নেই কোনো আত্মীয়তারও বন্ধন।

তারপরেও কেন নুসরাতের লাশ দেখতে হাসপাতালে ছুটে এসেছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে এই নারী জানান, ‘আমার একমাত্র মেয়ে ব্ল্যাড ক্যান্সারে মারা গিছে তিন/চার বছর আগে।

তখন থেকেই আমার মেয়ের বয়সী অন্য কোনো মেয়ে মারা গেলে আমার অন্তরে ব্যথা অনুভব করি। লাশ দেখতে হাসপাতালে চলে আমি।

নুসরাতের মারা যাওয়ার খবর টিভিতে আগের রাতেই জানতে পেরেছি।

NUSRAT

তাই ভোরেই আমি চলে এসেছি মর্গে।’ কিন্তু এখানকার লোকজন বাইরের কাউকেই মর্গের ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছে না।

ভেতরে ঢুকতে না পারলেও এর জন্য কোনো দুঃখবোধ নেই শায়লা বেগমের।

অন্তর থেকে নুসরাতের জন্য দোয়া করছেন তিনি।বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টা ৫০ মিনিটে জানাজার পর সন্ধ্যা ৬টায় সোনাগাজী আল হেলাল একাডেমির পাশে সামাজিক কবরস্থানে চির নিদ্রায় শায়িত করা হয় নুসরাতের মরদেহ।

চোখের পানিতে বুক ভিজিয়ে নুসরাতকে কবরে শায়িত করেন বাবা মাওলানা মুসা মানিক ও বড় ভাই নোমানসহ আত্মীয়-স্বজনরা।

এ সময় কবরস্থান এলাকায় তৈরি হয় হৃদয় বিদারক পরিস্থিতি। নুসরাতের বাবা ও ভাইয়ের কান্নায় ভিজে যায় কবরের মাটি।

nusrat

কান্না যেন থামছে না অগ্নিদগ্ধে নিহত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতের স্বজনদের।

সোনাগাজী উপজেলার উত্তর চরচান্দিয়া গ্রামের কবরের পাশে অঝোরে কেঁদেই চলেছেন ছোট ভাই রাশেদুল হাসান রায়হান।

বুক থাপড়িয়ে ‘বোন কাকে ডাকবো’ বলে বারবার বেহুস হচ্ছেন তিনি।

বাড়িতে বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান, বাবা একেএম মুসা মানিক ও মা শিরিন আক্তারের কোনো হুশ-ই নেই।

স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ বাতাশ ভারি হয়ে উঠছে।