আজ না পেরে বাধ্য হয়ে আপনার কাছে খোলা চিঠি লিখেছি

rafa‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী! আজ না পেরে বাধ্য হয়ে আপনার কাছে খোলা চিঠি লিখছি। আমি জানি না, ঠিক কোন ঠিকানায় আর ফোন নাম্বারে আমি আপনাকে খুঁজে পাবো। তাই খোলা চিঠি লিখে দিলাম, কেউ যদি দয়া করে আমার এই আহাজারি আপনার নিকট পৌঁছায়!’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে লিখা এ খোলা চিঠি মরণব্যাধি ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত বেসরকারি আদ-দ্বীন উইমেন্স মেডিকেল কলেজের ফাইনাল বর্ষের মেধাবী ছাত্রী জারিন তাসনিম রাফার। ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে সুস্থ হয়ে পড়াশোনা করে এমবিবিএস পাস করতে চান তিনি। কিন্তু এ পথে বড় বাধা ব্লাড ক্যান্সার। হাতে সময় মাত্র দুইমাস।

এ সময়ের মধ্যে দ্রুত বোনমেরু ট্রান্সপ্ল্যান্ট করানোর পরামর্শ দিয়েছেন ক্যান্সার বিশেষজ্ঞরা। চিকিৎসায় খরচ পড়বে ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা। ইতোমধ্যে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও তিনদফা কেমোথেরাপি চিকিৎসায় ২০ লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। টাকার অভাবে মরতে চান না রাফা। তাই মমতাময়ী প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসতে রাফা খোলা চিঠি লিখেছে। এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে রাফা জানায়, এভাবে সে মরতে চায় না। ক্যান্সারকে জয় করতে চায়। কিন্তু তা সম্ভব হবে কি-না তা জানেন না তিনি।

পটুয়াখালীর গলাচিপার বাঁশতলা গ্রামের বাসিন্দা এম এ বাশার ও কোহিনুর আক্তার সিদ্দিকা দম্পতির এক ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে রাফা বড়। বর্তমানে বনশ্রীর রোড -১, ব্লক-বি’র ১৪১৬ নাম্বার বাসায় বসবাস করছেন।

রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ২০১০ সালে এসএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫ ও ২০১২ সালে একই স্কুল থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন রাফা।

ঠিকাদার বাবা ও মায়ের ইচ্ছা মেয়েকে ডাক্তারি পড়াবেন। সরকারি মেডিকেলে সুযোগ না পাওয়ায় জমি-জমা বিক্রি করে মেয়েকে আদ-দ্বীন উইমেন্স মেডিকেল কলেজে (২০১৩-১৪) ভর্তি করান।

মা, বাবা ও ছোট ভাইকে নিয়ে সুখেই দিন কাটছিল রাফার। বছর গড়িয়ে ফাইনাল ইয়ারে উঠেন। সবার মনে আনন্দ আর মাত্র একটি বছর গেলেই রাফা এমবিবিএস পাস করবে। কিন্তু বিধি বাম। আনুমানিক আড়াই মাস আগে রামপুরায় সড়ক দুর্ঘটনায় মস্তিষ্কে মারাত্মক আঘাত পান রাফা। প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। ওই সময় মাথার এমআরআই করিয়ে ভীষণ দুশ্চিন্তায় ছিলেন। কিন্তু রিপোর্ট ভালো আসায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন তিনি। কিন্তু কিছুদিন পর তার ঘন ঘন জ্বর আসে। নিজে ডাক্তারি পড়ায় জ্বর কেন আসছে তা বুঝতে ৮/১০ দিন সময় নেন। কিন্তু তবুও সুস্থ না হওয়ায় চিকিৎসক দেখান। চিকিৎসক তাকে বিভিন্ন শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করান।

পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে পেয়ে রাফার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। দুই চোখকে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। রিপোর্টে লিখা তার ব্লাড ক্যান্সার। রিপোর্ট ভুল হয়েছে কিংবা কারও সঙ্গে বদল হয়েছে ভেবে বঙ্গবুন্ধ শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএম্এমইউ), আইসিডিডিআরবিসহ রাজধানীর খ্যাতনামা চারটি সেন্টারে আবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করায় রাফার পরিবার। কিন্তু সব রিপোর্টেই ব্লাড ক্যান্সার হয়েছে বলে নিশ্চিত করে।

এবার রাফার বুকে মনোবল যুগিয়ে প্রথমে বিএসএমএমইউ হাসপাতালের হেমাটোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. ইউনুস ও পরে অ্যাপোলো হাসপাতালে ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডা. আবু জাফর সালেহর অধীনে চিকিৎসা নেন।

রাফার ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার খবর কলেজে ছড়িয়ে পড়লে সহপাঠী, সিনিয়র ও জুনিয়রদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। সবাই তাকে সাহস জোগায় ও আর্থিক সাহায্য দিয়ে এগিয়ে আসে। এ সময় রাফা কলকাতার টাটা মেডিকেল সেন্টারে যান। ওখান থেকে জানানো হয়, বোনমেরু ট্রান্সপ্ল্যান্টে ৭০/৮০ লাখ রুপি অর্থাৎ বাংলাদেশি টাকায় প্রায় এক কোটি টাকা খরচ হবে। খরচ যোগানোর নিশ্চয়তা পেলেই কেবল তারা চিকিৎসা শুরু করবেন।

দেশে ফিরে এসে রাফা অ্যাপোলো হাসপাতালে কেমোথেরাপি চিকিৎসা শুরু করেন। প্রথম কেমোথেরাপিতে কাজ না হলেও দ্বিতীয় ও তৃতীয়দফা কেমোথেরাপি দেয়ার পর চিকিৎসক জানান, আপাতত তার শরীরে ক্যান্সারের জীবানু নেই! তবে দ্রুততম সময়ে বোনমেরু ট্রান্সপ্ল্যান্ট না করাতে পারলে আবার ক্যান্সারের জীবানু ছড়িয়ে পড়বে সারা শরীরে। বোনমেরু ট্রান্সপ্ল্যান্টের জন্য ইতোমধ্যে সে তার ভাইয়ের এইচএলএ টাইপিং করিয়েছে। টিস্যু টাইপিং মিলে গেলে তার ভাই তাকে রক্ত দিবে।

এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে রাফা জানায়, তার বাবা ছোটখাটো ঠিকাদারি ব্যবসা করতেন। গত বছর তার ওপেন হার্ট সার্জারি হলে আগের মতো আয় রোজগার করতে পারছেন না। তবুও চার সদস্যের পরিবার ভালো চলছিল। কিন্তু গত তিনমাসে চিকিৎসায় ২০ লাখেরও বেশি টাকা খরচ হওয়ায় পরিবারটি সর্বশান্ত হয়ে গেছে।

রাফা কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানায়, সে এভাবে মরতে চায় না। ক্যান্সারের সঙ্গে যুদ্ধ করে জয়ী হতে চায় । কিন্তু এতো টাকা জোগাড় করা তার পরিবারের পক্ষে সম্ভব নয়। পরিচিত অপরিচিত চিকিৎসক, নিজের মেডিকেল কলেজ ছাড়াও অনেক মেডিকেল শিক্ষার্থী তার পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু ১ কোটি টাকা কীভাবে জোগাড় হবে। তাই শেষ ভরসা হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি লিখেছেন।

খোলা চিঠিতে রাফা লিখেছেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী! আজ না পেরে বাধ্য হয়ে আপনার কাছে খোলা চিঠি লিখছি। আমি জানি না, ঠিক কোন ঠিকানায় আর ফোন নাম্বারে আমি আপনাকে খুঁজে পাবো। তাই খোলা চিঠি লিখে দিলাম, কেউ যদি দয়া করে আমার এই আহাজারি আপনার নিকট পৌঁছায়!,

আমার বয়স ২৩। আমি একজন ফাইনাল বর্ষের মেডিকেল ছাত্রী। আজ আড়াই মাস ধরে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছি! আমার একিউট মায়েলোব্লাস্টিক লিউকেমিয়া বা এক ধরনের ব্লাড ক্যান্সার যা মধ্যম পর্যায়ে ধরা পড়ে। এখন আমাদের দেশের বিভিন্ন অভিজ্ঞ ও স্বনামধন্য ডাক্তাররা আমাকে বলেছেন, হাতে বেশি সময় নেই।

আমাকে দ্রুততম সময়ে অ্যালোজেনিক ট্রান্সপ্ল্যান্টে যেতে হবে যা বাংলাদেশে এখনো শুরু হয়নি এবং আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে যার উন্নত চিকিৎসা রয়েছে কিন্তু অত্যন্ত ব্যয়বহুল (৮০ লাখ টাকা) যা আমার মধ্যবিত্ত বাবা মায়ের পক্ষে ব্যয় করা সম্ভব নয়। কেমো নিয়ে নিয়ে আমরা সর্বশান্ত। আরও যত দেরি হবে ততই কেমো খরচ এবং আমার মৃত্যুঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে। আমার জীবনের শুরুতেই আজ মেঘের অন্ধকার নেমে এসেছে। হায়াত আল্লাহর হাতে তবু চেষ্টা করে দেখতে যদি পারতাম! যদি আমার চিকিৎসাটা হত! যদি আপনাদের মাঝে ফিরে আসতে পারতাম!

আপনি তো কত অসহায়ের পাশে ছিলেন, কত পিতা-মাতা হারা সন্তানের দায়িত্ব নিয়েছেন, আমিও এই দেশের এবং আপনারই সন্তান তবে কেন আমাকে বুকে টেনে নেবেন না, এই দিনে?

আমি মানি, আমি বিখ্যাত সাবিনা ইয়াসমিন না, আমি ছোটখাটো একজন মেডিকেল ছাত্রী। তাই বলে কি আমার জীবনের কোনো মূল্যই নেই? বেঁচে থাকলে দেশের জন্য আমি কি কিছুই করতে পারতাম না? আমিও তো মেডিকেল কমিউনিটিরই একজন। প্রতি মুহূর্তে আমি মৃত্যুর প্রহর গুণছি। এক একদিন সময় আমার জীবনের প্রদীপ নিভিয়ে দিচ্ছে ধীরে ধীরে দেশমাতা! আপনি কি এই অসহায় মেয়েটির বেঁচে থাকার এই যুদ্ধে শামিল হবেন?