অবশেষে জানা গেলে সেই শিক্ষক কোন দেশের

teacherপৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ রয়েছেন বলেই সভ্যতা গতি পায়। তাদের হৃদয় নাড়া দেওয়া কর্ম আলোড়িত করে গোটা বিশ্বকে। তারা নীরবে নিভৃতে গড়ে যান পরবর্তী প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী।

বলছিলাম মেক্সিকোর এক মানুষ গড়ার কারিগরের কথা। এক স্কুল শিক্ষকের কথা। যিনি একটি বাচ্চাকে কোলে নিয়ে ক্লাসে পাঠদান করে চলেছেন। আর বেশ কিছুদিন ধরেই সেই ছবিটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে গিয়েছিল। নানা জন নানা মত প্রকাশ করেছিলেন ছবিটি নিয়ে।

কেউ কেউ বলেছিলেন, এই শিক্ষক তার বাচ্চাকে নিয়ে ক্লাস করছেন। জন্মের সময় ওর মা পৃথিবী ছাড়েন। তাই বাবা ওকে কোলে নিয়েই পেশাগত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা ভিন্ন কিছু। এর পেছনে রয়েছে এক স্কুল শিক্ষকের উদারতার অনন্য নিদর্শন। রয়েছে মজার এক ঘটনা।

ঘটনা গত বছরের। আর ছবিটির পেছনের গল্প হলো, বাচ্চাটা আসলে ওই স্কুল শিক্ষকের এক ছাত্রীর। এত ছোট বাচ্চাকে বাড়িতে রেখে ওই শিক্ষার্থীর পক্ষে ক্লাস করা সম্ভব নয়। কিন্তু শিক্ষক চান, ছাত্রীর শিক্ষাজীবন এভাবে নষ্ট না হোক। তাই তিনি ছাত্রীর বাচ্চাকে কোলে নিয়ে ক্লাস করছেন।

জানা যায়, ওই মহান শিক্ষককের বসবাস মেক্সিকোর উপকূলীয় শহর আকাপুলকো। ঘটনাটি নিয়ে প্রতিবেদন করেছিল মেক্সিকোর এক পত্রিকা। তিনি ওই শহরের একটি হাইস্কুলে শিক্ষকতা করেন। তারই এক ছাত্রী হাইস্কুল শেষ না করতেই মা হয়েছেন। তাই ক্লাসে আসতে পারছিলেন না।

কিন্তু তার কোর্স শেষ করা জরুরি। তাই ক্লাসের সময় বাচ্চাটিকে দেখার দায়ভার শিক্ষক নিজেই নেন। মোইসেস রেইয়েস সান্দোভাল নামের এক ফেসবুক ব্যবহারকারী ওই ছবিটিসহ পোস্ট দিয়েছিলেন। তার সেই পোস্ট থেকেই ছবিটি ভাইরাল হয়ে যায়, আর এই শিক্ষক সবার হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন।

গত সোমবার সন্ধ্যায় ফেসবুকের একটি পেইজে ছবি আপ করা হয়। মুহূর্তের মধ্যেই তা নজর কাড়ে অগণিত ফেসবুক ব্যবহারকারীর। আস্তে আস্তে গোটা বিশ্বেই ভাইরাল হয়ে যায় ছবিটি।

ছবির নিচে মন্তব্যে একজন লিখেছেন, ‘বিনম্র শ্রদ্ধা এই পিতার প্রতি। যিনি মায়ের মমতায় আগলে রেখেছেন শিশুকে। সন্তানের কাছে পিতা-মাতাই তার পরম শান্তির ও নিরাপদ আশ্রয়স্থল।’ একইভাবে একজন নারী তার মন্তব্যে লিখেছেন, ‘এই শিক্ষক শুধুই একজন শিক্ষক না, তিনি একজন আদর্শ পিতাও। শ্রদ্ধা তার প্রতি।’

কেউ কেউ শুধু শ্রদ্ধা শব্দটি লিখেই এই শিক্ষক পিতাকে সম্মান জানিয়েছেন। একজন মধ্য বয়সী নারী লিখেছেন, ‘নিশ্চয়ই তিনি খুব দায়িত্বশীল। এই শিক্ষকের কাছে পিতার স্নেহ ও মায়ের মমতা পাবে শিশুটি।’ একজন পুরুষ লিখেছেন, ‘বাবারা এরকমই হয়। বাবা কখনো খারাপ হয় না। একজন শিক্ষার্থী লিখেছেন, ‘এরকম শিক্ষক জাতির জন্য অহংকার। বাবা হিসেবে তিনি সকল বাবাদের আদর্শ হতে পারেন।’ শিক্ষকের প্রতি সম্মান জানিয়ে এক তরুণী তার মন্তব্যে লিখেছেন, ‘যিনি সফল পিতা, তিনি নিশ্চয়ই শিক্ষক এবং স্বামী হিসেবেও সফল। একজন ভালো মানুষ সাধারণত সকল ক্ষেত্রেই ভালো মানুষের পরিচয় দেন। সকল পুরুষরাই তার মতো হোক। এই পিতা ও শিশুর জন্য অনেক শুভকামনা।’

এভাবেই প্রতিটি মন্তব্যে এই শিক্ষক-পিতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন ফেসবুক ব্যবহারকারীরা। কেউ কেউ অবশ্য ছবিটি বিশ্লেষণ করেছেন। তাদের মধ্যে এক তরুণী লিখেছেন, ‘পিকচারটি দেখে মনে হচ্ছে এটি দেশের বাইরের কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে শিক্ষক ও তার পেছনে বসা ছাত্রীদের দেখে তাই মনে হচ্ছে। যাই হোক, ছবির এই শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা থাকলো।’ একইরকম মন্তব্য করে এক তরুণ লিখেছেন, ‘তিনি যে দেশের বাসিন্দাই হোন, তিনি পিতা এটাই বড় কথা।’

ছবির শিক্ষকের বিস্তারিত পরিচয় জানতে খোঁজ নেয়া হয় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এরকম কোনো শিক্ষকের সন্ধান পাওয়া যায়নি। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের প্রধান বেলাল আহমেদ বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে এরকম কোনো ঘটনা ঘটেনি। ওই শিক্ষক নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের না। ধারণা করা হচ্ছে তিনি দেশের বাইরের কেউ হতে পারেন। তবে সত্যিই যদি তাই হয় তিনি যে দেশেরই হোন তার প্রতি আমরা শ্রদ্ধা জানাই।

ওই শিক্ষক পিতার ছবিটি সোমবার আপ করা হলেও গতকাল মঙ্গলবার বিকালে ওই পেইজে ছবিটি পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, ছবির শিক্ষকের সঠিক পরিচয় দিতে না পারার কারণে তা রিমুভ করা হয়েছে। ক্ষুদেবার্তার মাধ্যমে এ বিষয়ে জানতে চাইলে পেইজের এডমিন লিখেন, ‘উই ট্রাই টু বি এজ রেসপন্সিভ এজ পসিবল।’ পরে জানা গেল ছবিটি মেক্সিকোর।