অবশেষে জানা গেল,মিয়ামারের বৌদ্ধরা যে কারণে আরাকানের মুসলমানদের সহ্যই করতে পারে না

rohingaএবার বেরিয়ে এলো তথ্য, বেশকিছু কারণে আরাকানের মুসলমানদের সহ্যই করতে পারে না মিয়ামারের বৌদ্ধরা। জাতিগত বিদ্বেষ, বর্ণবাদ, ধর্মীয় পরিচয় আর রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে এখন পর্যন্ত দুই লাখের বেশি রোহিঙ্গা মুসলমানকে হত্যা করেছে বর্মিরা। বর্তমানে চলমান গণহত্যা ও নির্মূল অভিযানসহ ইতিহাসে বড় দাগে সাতবার রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে এ ধরনের পৈশাচিকতার ঘটনা লিপিবদ্ধ আছে। এর মধ্যে শুধু ১৯৪২ সালের দাঙ্গার সময় হত্যা করা হয় এক লাখ রোহিঙ্গা। প্রাণ বাঁচাতে ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে যায় পাঁচ লাখের বেশি রোহিঙ্গা।

১৭৮৪ সালে বর্মি রাজা ভোদাপায়া আরাকান দখলের পর বিদ্রোহ দমনে কমপক্ষে ৩০ হাজার আরাকানিকে হত্যা করে। ১৯৩৮ সালে ৩০ হাজার, ১৯৭৮ সালে ১০ হাজার রোহিঙ্গা নিহত হয়। এ ছাড়া ১৯৯১, ২০১২ থেকে ২০১৪, ২০১৬ এবং বর্তমান চলমান গণহত্যায় কয়েক হাজার রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে। এ ছাড়া বর্মিদের হত্যাকাণ্ড থেকে প্রাণ বাঁচাতে গভীর জঙ্গলে আশ্রয় নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে মারা গেছে অগণিত রোহিঙ্গা মুসলমান।

প্রতিবার নির্মূল অভিযান ও গণহত্যার সময় পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে হাজার হাজার রোহিঙ্গা ঘরবাড়ি। চালানো হয়েছে নির্বিচার ধর্ষণ। আর প্রাণ বাঁচাতে অন্যত্র চলে গেছেন লাখ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান। অনেকে বছরের পর বছর করছে উদ্বাস্তু জীবনযাপন। এভাবে বারবার হত্যা, পাশবিক নির্যাতন, ঘরবাড়ি পোড়ানো, ঘরছাড়া করে একটি জাতিকে শারীরিক, মানসিক, সহায়সম্পদ সব দিক দিয়ে নিঃস্ব করে ফেলা হয়েছে।

১৭৯৮ সালে প্রাণ বাঁচাতে তিন ভাগের দুই ভাগ আরাকানি আশ্রয় নেয় বাংলাদেশে। গভীর জঙ্গলে আশ্রয় নিয়ে মারা যায় অনেকে। ১৯৭৮ সালে তিন লাখ, ১৯৯১-৯২ সালে দুই লাখ ৬৫ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এ ছাড়াও প্রতিবারই নিজ দেশে উদ্বাস্তু হয় আরো অনেকে।

২০১২-২০১৪ সালে এক লাখ ৪০ হাজার ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়। তাদের মধ্যে এক লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা নিজ দেশে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেন। ২০১৬ সালে ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসেন। নিজ দেশে অন্যত্র চলে যান আরো অনেকে। আর চলতি বছরের ২৫ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া নির্মূল অভিযান ও গণহত্যার ফলে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন ৫ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান। বর্তমানে বাংলাদেশ ছাড়াও পাকিস্তান সৌদি আরব, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে ৮ লাখের মতো রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছে।

১৯৪২ সালের গণহত্যা রোহিঙ্গাদের জীবনে সবচেয়ে শোকাবহ ঘটনা। ১৯৪২ সালের জুন মাসে জাপানিদের হাতে পতন ঘটে আরাকানের রাজধানী আকিয়াব বন্দরের। এ সময় ব্রিটিশরা আরাকান ছেড়ে চলে যাওয়ার পরপরই মগরা ঝাঁপিয়ে পড়ে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর। মেতে ওঠে গণহত্যায়। মুসলমান অধ্যুষিত গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয় তারা। নির্বিচারে লুটপাট, হত্যা, ধর্ষণ আর ধ্বংসের তাণ্ডবলীলা চালায় তারা। রোহিঙ্গাদের কাটা মস্তক বর্শার মাথায় গেঁথে রাস্তায় পাশবিক নৃত্যের কাহিনী আজো রোহিঙ্গা পল্লীর লোকগাথায় বিদ্যমান। আকিয়াবের অধিবাসী খলিলুর রহমান লিখিত ‘কারবালা-ই-আরাকান’ গ্রন্থে এর বিবরণ রয়েছে।

বার্মার সাবেক মন্ত্রী, এমপি ও রাজনীতিবিদ সোলতান মাহমুদ লিখিত এক প্রবন্ধে ১৯৪২ সালের গণহত্যায় ৩৭৬টি গ্রাম উচ্ছেদ হওয়ার বিবরণ রয়েছে। ১৯৪২ সালের এ গণহত্যা এড়াতে অগণিত আরাকানি বিশেষ করে মুসলমানেরা তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে গভীর জঙ্গলে আশ্রয় নেন এবং পরে জঙ্গলেই তাদের মৃত্যু হয় প্রতিকূল পরিবেশের কারণে।

রাজনৈতিক প্রতিহিংসারও শিকার রোহিঙ্গারা : ১৯৪২ সালে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বর্মিদের জাতিবিদ্বেষের আরেকটি কারণ হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তারা ব্রিটিশদের পক্ষ নিয়েছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে বার্মা জাপানিদের দখলে আসে। এক সময় বার্মার জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয় এবং এর পৃষ্ঠপোষকতা দেয় জাপান। জাপানের পৃষ্ঠপোষকতায় তখন গোটা বার্মার জাতীয় নেতায় পরিণত হন জেনারেল অং সান যিনি বর্তমান মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি’র পিতা।

বর্মি ও জাপানিরা মিলে যুদ্ধ করে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে। অপর দিকে রোহিঙ্গা মুসলমানেরা ব্রিটিশদের পক্ষ নেন। ১৯৪২ সালে ব্রিটিশদের পরাজিত করে জাপানিরা বার্মা দখলের সাথে সাথে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে গণহত্যায় মেতে ওঠে বর্মিরা। রোহিঙ্গা মুসলমানরা ব্রিটিশদের পক্ষ নেয়ার কারণ ছিল বিজয়ী হলে আরাকানকে স্বাধীন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ব্রিটিশরা। কিন্তু তারা পরে তাদের প্রতিশ্রুতি রাখেনি।
১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের আগে রোহিঙ্গা নেতাদের একটি অংশ পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশের সাথে যোগ দেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। সে কারণেও বর্মিরা রোহিঙ্গাবিদ্বেষী বলে মনে করেন কেউ কেউ।

১৯৪২ সালে রোহিঙ্গা গণহত্যার প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠে স্বাধীন আরাকান প্রতিষ্ঠার আন্দোলন।
মোহাম্মদ জাফর কাওয়াল নামে একজন পল্লীগীতি কবি প্রথমে নেতৃত্ব দেন এ লড়াইয়ে। রোহিঙ্গা হত্যা নির্যাতন নিয়ে তার রচিত বিপ্লবাত্মক গানে উদ্বুদ্ধ হয়ে লোকজন দলে দলে তার বাহিনীতে যোগ দেন। সাধারণ মানুষের কাছে তারা মুজাহিদ বাহিনী নামে পরিচিতি পায়। এ সময় কারেন জাতিসহ অন্যান্য জাতির মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে বর্মিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। রোহিঙ্গারা বার্মা সরকারের কাঠামোর মধ্যেই তাদের সমস্যার সমাধান চাইলেও তাদের বারবার বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তৎকালীন বর্মি প্রধানমন্ত্রী উ নু’র আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১৯৬১ সালের ৪ জুলাই রোহিঙ্গা মুজাহিদরা অস্ত্র সমর্পণ করে।

কিন্তু ১৯৬২ সালের ২ মার্চ জেনারেল নে উইন ক্ষমতা দখল করার পর রোহিঙ্গাদের জীবনে নেমে আসে দুর্ভাগ্যের দীর্ঘ এক কালো অধ্যায় যার পৈশাচিক পরিণতি এখন দেখছে বিশ্ববাসী।
মিয়ানমারে বর্তমানে রোহিঙ্গা মুসলমান মেরে জনপ্রিয়তা অর্জনের প্রতিযোগিতা চলছে সু চি ও সেনাদের মধ্যে। রোহিঙ্গাদের পক্ষে কথা বললে জনপ্রিয়তা হারাতে হবে তাই সেনা পরিচালিত গণহত্যায় প্রকাশ্যে জোর গলায় সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে সু চি উগ্র বৌদ্ধদের সমর্থন ধরে রাখার লক্ষ্যে।
এভাবে ধর্মীয় ও জাতিগত বিদ্বেষ ছাড়াও কখনো কখনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক নির্মমতারও অসহায় শিকার হয়েছে রোহিঙ্গা মুসলমানেরা।