অগ্রণী ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষা ৯ জুন

Agrani-Bankপ্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে তোলপাড়ের মধ্যেই সম্পন্ন করা অগ্রণী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার পদে নিয়োগের সকালের ভাগের পরীক্ষা বাতিল হচ্ছে না। প্রশ্ন ফাঁসের ‘অকাট্য প্রমাণ’ না থাকায় এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পরীক্ষা গ্রহণকারী কর্তৃপক্ষ। তবে কর্তৃপক্ষের এ সিদ্ধান্ত মানতে পারছেন না ভুক্তভোগী চাকরিপ্রার্থীরা। তারা পরীক্ষা বাতিল না করলে আন্দোলনের হুমকি দিয়েছেন। অন্যদিকে স্থগিত হওয়া শুক্রবার বিকালের ভাগের পরীক্ষা আগামী ৯ জুন নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। রোববার পরীক্ষা গ্রহণকারী কর্তৃপক্ষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগ এ তথ্য জানিয়েছে।

ঢাবির ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা প্রথম ধাপের পরীক্ষা বাতিলের কোনো সিদ্ধান্ত নেননি।

বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. আবু তালেব যুগান্তরকে বলেন, ‘অগ্রণী ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষা ও পরবর্তী করণীয় নিয়ে আমরা বৈঠক করেছি। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, স্থগিত হওয়া দ্বিতীয় ধাপের নিয়োগ পরীক্ষা ৯ জুন হবে। অর্থাৎ শুক্রবার বিকালে যাদের পরীক্ষা নেয়া হয়নি, তারাই কেবল ৯ জুনের পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন। তবে ওইদিন পরীক্ষাটি কখন নেয়া হবে এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারেননি অধ্যাপক আবু তালেব। তিনি বলেন, দ্বিতীয় অংশে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে শুনে আমরা পরীক্ষা বাতিল করেছি। কিন্তু প্রথম অংশে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে এমন সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ আমরা পাইনি। তাই এ অংশের পরীক্ষা বাতিল করা হবে না। বিভিন্ন জন বিভিন্ন কথা বলছে। তবে এ কথা কেউ প্রমাণ করতে পারেনি প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। ফলে আমরা আগের সিদ্ধান্তই বহাল রাখছি। যদিও শনিবার তিনি যুগান্তরকে বলেছিলেন, যদি প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে এমন প্রমাণ পাই, তাহলে প্রথম ভাগের পরীক্ষা বাতিল করব।

একদিকে ফাঁস হওয়া প্রশ্নে নেয়া পরীক্ষা বাতিল না করা; অন্যদিকে জালিয়াত চক্রকে আইনের আওতায় আনতে না পারায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পরীক্ষার্থীরা। প্রথম ভাগের পরীক্ষা বাতিল না করা হলে কঠোর আন্দোলনে যাওয়ারও হুমকি দিয়েছেন কেউ কেউ। রকিবুল হাসান নামে এক চাকরিপ্রার্থী যিনি সকালের ভাগের পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন তিনি যুগান্তরকে বলেন, পরীক্ষা শুরুর আগেই উত্তরসহ অনেকের কাছে প্রশ্নপত্র দেখেছি, যা পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের সঙ্গে হুবহু মিলে গেছে। তাই প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে এটি সুস্পষ্ট; অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। আমরা আশা করছি নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের শুভবুদ্ধির উদয় হবে এবং তারা প্রথম ভাগের পরীক্ষা বাতিল করবেন। না হলে আন্দোলনে নামা ছাড়া উপায় থাকবে না। এ রকম আরও অন্তত ১০ চাকরিপ্রার্থী যুগান্তরকে ক্ষোভের কথা জানান।

প্রশ্ন প্রণয়নকারী সূত্র জানায়, এ ধরনের প্রশ্ন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিভাগ অত্যন্ত সতর্ক ভূমিকায় থাকে। পরীক্ষার আগের রাতেও এই প্রশ্নপত্র কোনো কেন্দ্রে পাঠানো হয় না। এছাড়া প্রশ্ন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্তদের বাইরের কারও প্রশ্নটি দেখার সুযোগ নেই। তাহলে কীভাবে প্রশ্নপত্রের কপি বাইরে গেল তা নিয়ে সৃষ্ট রহস্য কাটছে না। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে পরীক্ষা গ্রহণকারী কর্তৃপক্ষের কোনো অসাধু ব্যক্তি অথবা যেসব কেন্দ্রে পরীক্ষা নেয়া হয়েছে, সেই কেন্দ্রের সংশ্লিষ্ট কেউ জড়িত।

এ বিষয়ে অধ্যাপক মো. আবু তালেব জানান, শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে প্রথম ভাগের পরীক্ষা ছিল। কেন্দ্রগুলোতে প্রশ্ন পৌঁছানো শুরু হয় সকাল সাড়ে ৭টা থেকে। এমন প্রক্রিয়ায় প্রশ্নগুলো পৌঁছানো হয়, যাতে ফাঁস হওয়ার সুযোগ নেই। তার কথার সূত্র ধরে অনুসন্ধান চালায় যুগান্তর। যুগান্তরের নিজস্ব অনুসন্ধান বলছে, প্রণয়নকারীদের হাত থেকে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র যখন বিভিন্ন কেন্দ্রে চলে যায়, সেখান থেকে প্রশ্নটি ফাঁস হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। কারণ এর আগেও বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় এই প্রক্রিয়ায় প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই প্রক্রিয়ায় সাধারণত জালিয়াত চক্র কোনো একটি কেন্দ্রের প্রধান বা সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তা অথবা কর্মচারীকে বড় অংকের টাকার বিনিময়ে ‘ম্যানেজ’ করে। ফলে পরীক্ষা শুরুর আগে যখন প্রশ্নপত্র প্রণয়নকারী কর্তৃপক্ষের হাত থেকে প্রশ্নটি বিভিন্ন কেন্দ্রে চলে যায়, তখন তাদের হাত থেকেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে থাকে। অন্যদিকে টাকার বিনিময়ে একটি গ্রুপকে আনা হয়, যারা প্রশ্নের সঠিক উত্তর নির্বাচন করেন। এভাবে উত্তরসহ প্রশ্ন ফাঁস হয়। বিক্রি হয় লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে। তবে প্রশ্নপত্র প্রণয়নকারী কর্তৃপক্ষের কিছু অসাধু ব্যক্তির নৈতিক স্খলনের কারণে প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার নজিরও রয়েছে। এ বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন ফাঁসের বিরুদ্ধে কাজ করছেন এমন একজন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক ড. এম আমজাদ আলী যুগান্তরকে বলেন, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও ছাপা সংশ্লিষ্ট কেউ অথবা সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের কেউ জড়িত না থাকলে এভাবে প্রশ্নপত্র ছড়িয়ে পড়া সম্ভব নয়। এজন্য পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট শিক্ষক থেকে শুরু করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। তাহলে প্রশ্ন ফাঁস রোধ করা সম্ভব হবে। তবে যেভাবেই হোক, প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক না কেন তাদের ধরতে সফলতা দেখাতে পারেনি সংশ্লিষ্টরা। প্রশ্নপত্রের কপি পরীক্ষার্থীদের হাতে হাতে চলে গেলেও মূল হোতারা রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এখনও রহস্যের ঘেরাটোপে বন্দি প্রশ্নফাঁসের ঘটনা।

শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত অগ্রণী ব্যাংকের নিয়োগের প্রথম ভাগের পরীক্ষাটি হয়। কিন্তু এর আগেই শিক্ষার্থীদের হাতে প্রশ্নপত্রের কপি চলে যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও উত্তরসহ প্রশ্নপত্রের কপি ছড়িয়ে পড়ে।-যুগান্তর